স্বনামধন্য লেখিকা লীলা মজুমদারের জীবনী | Biography of Leela Majumdar

Wednesday, July 10 2024, 10:24 am
highlightKey Highlights

লীলা মজুমদার নামটির সঙ্গে শিশু সাহিত্যের বিষয়টি এমন ভাবে জড়িয়ে রয়েছে যে, তাঁর লেখাগুলি বাঙালি আজও ভুলতে পারে না। তাঁর সাহিত্যের ছোঁয়া নিহিত আছে প্রতি বাঙালির শৈশবকালের স্মৃতিতে। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিশু সাহিত্যিকদের সাথে তাঁর নামও জড়িত।


লেখক পরিচিতি | Author introduction of Leela Majumdar

লীলা মজুমদার ছিলেন একজন ভারতীয় বাঙালি লেখিকা। তিনি কলকাতার রায় পরিবারের প্রমদারঞ্জন রায় ও সুরমাদেবীর কন্যা। তাঁর বাবা ভারতীয় জরিপ বিভাগের অফিসার ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক। ২৬ ফেব্রুয়ারি ,১৯০৮ সালে এই প্রতিথযশা লেখিকার জন্ম।  

লেখিকার ছেলেবেলা ও শিক্ষা | Leela Majumdar's childhood and education

Trending Updates

সাহিত্যিক সমাবেশে ঘিরে থাকা বিশ্বখ্যাত রায়চৌধুরী পরিবারের সদস্য লেখিকা লীলা মজুমদার। তিনি তাঁর বাল্যজীবন কাটান শিলং-এ, সেখানকার লরেটো কনভেন্টে তিনি পড়াশোনা করেন। তারপর সেন্ট জনস ডায়সিসেশন স্কুলে ভর্তি হলেন তিনি। পরবর্তী সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পাঠ শেষ করেন।প্রখ্যাত লেখক উপেন্দ্রকশোর রায়চৌধুরী ছিলেন লীলার জ্যাঠামশাই। সেই সূত্রে তিনি ছিলেন শিশু সাহিত্যিক সুকুমার রায়ের খুড়তুতো বোন, ও সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল পিসি-ভাইপোর। লেখিকা ছোটবেলা থেকেই অটোগ্রাফ সংগ্রহের নেশা ছিল। তিনি প্রশান্তকুমার মহলানবিশকে একটি খাতা দিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের একটি অটোগ্রাফ আনতে পাঠিয়েছিলেন। কবি সেই খাতায় সাক্ষরের সাথে সাথে লিখে দিয়েছিলেন একটি কবিতাও।

নামের আখর কেনো লিখিস নিজের সকল কাজে ?
পারিস যদি প্রেমের আখর
রাখিস জগৎ মাঝে। 

লীলা মজুমদার

ব্যক্তিগত জীবন | Personal life of Leela Majumdar

বিবাহপূর্ব নাম ছিল লীলা রায়, লীলা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ১৯৩৩ সালে, পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে দন্ত চিকিৎসক ডাঃ সুধীর কুমার মজুমদারের সাথে সংসার করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পিতা প্রমদারঞ্জনের এই বিবাহে প্রবল বিরোধিতা ছিল, তা সত্ত্বেও লেখিকা তাঁর স্বনির্বাচিত পাত্রকে গ্রহণ করেছিলেন জীবনসঙ্গী রূপে। বিয়ের পরও পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে সম্পর্ক অভঙ্গুর ছিল কিন্তু পিতার ও মেয়ের সম্পর্ক চিরকালের মতো ছিন্ন হয়ে যায়। লীলা-সুধীরের বৈবাহিত জীবন খুব সুখের ছিল। স্বামী সর্বদা লীলার সাহিত্য চর্চায় সহযোগিতা করেছিলেন। লেখালেখিতে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন তাঁকে, পরবর্তী সময়ে তাদের দুই সন্তান হয়, এক ছেলে ও এক মেয়ে; পুত্র ডাঃ রঞ্জন মজুমদার ও কন্যা কমলা চট্টোপাধ্যায়।

কর্মজীবন | Leela Majumdar’s Career

দার্জিলিংয়ের মহারানী গার্লস স্কুলে পড়ানোর মধ্যে দিয়ে কর্মজীবন শুরু হয় তাঁর। এরপর স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের ডাকে বিশ্বভারতীতে, ইংরেজীর শিক্ষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু বেশী দিন থাকলেন না সেখানে। ফিরে এলেন কলকাতায়। তারপর আশুতোষ কলেজের মহিলা বিভাগে পড়ানো শুরু করেন। সেই চাকরীতেও থাকেন নি বেশী দিন। চাকরি ছেড়ে মনোনিবেশ করেন স্বাধীন সাহিত্যচর্চায়। দীর্ঘ দুদশক সে ভাবে কাটিয়ে লীলা মজুমদার আকাশবানীতে প্রযোজক হিসাবে যোগ দেন। টানা সাত আট বছর সেখানে কাজ করেছিলেন। তারপর আর কোথাও চাকরি করেন নি তিনি। তবে এই সবের মাঝেও কলমকে ছুটি  দেননি কখনো।

Install the latest bengali news app today

সাহিত্যকর্ম | Literary work by Leela Majumdar

লীলা মজুমদার মাত্র তের বছর বয়সে লেখা শুরু করেন শিশুদের চিরকালের প্রিয় পত্রিকা সন্দেশ-এ। তিনি বহু সংখ্যক বাংলা গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাস রচনা করে নানান পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হন। 

তাঁর লেখা প্রথম গল্পের নাম 'লক্ষ্মীছাড়া', যা ১৯২২ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় সন্দেশ পত্রিকায়। লেখিকার ভাইপো সত্যজিৎ রায়  ১৯৬১ সালে সন্দেশ পত্রিকা আবার পুনর্জীবিত করার পর তিনি ১৯৬৩ থেকে ১৯৯৪  অবধি দীর্ঘ ৩১ বছর সাম্মানিক সহ-সম্পাদক হিসাবে সেই পত্রিকায় কাজ করেছিলেন, ১৯৯৪-এ তার স্বাস্থ্যের অবনতির জন্য অবসর নেন। তিনি প্রায় আট দশকের মতো একটানাভাবে সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেন।

আরও পড়ুন:  আজকের সেরা খবর

ছোটদের জন্য তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রচনা হল | Some notable essays written by Leela Majumdar for children

হলদে পাখির পালক, টং লিং, পদিপিসির বর্মিবাক্স, নাকু গামা, সব ভুতুড়ে, মাকু, গল্পসল্প। তাঁর রচিত ' পদিপিসির বর্মিবাক্স ' চলচ্চিত্রায়িত হওয়াr অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। তাঁর লেখা ছোটদের শ্রেষ্ঠ গল্প মনিমালা, বাঘের চোখ, টাকা গাছ, লাল-নীল দেশ্লাই, বাঁশের ফুল, ময়না, শালিক, আগুনি বেগুনি, টিপুর ওপর টিপুনি, শিবুর ডায়েরি, ফেরারী, এই যে দেখা, শ্রীমতি, পেশা বদল এসবও বহু খ্যাতি অর্জন করেন। 

প্রথম বড়দের গল্প ‘সোনালি রুপালি’ প্রকাশিত হয় ‘বৈশাখী’ পত্রিকায়। সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর তাগিদে লেখেন গল্প টি। তিনি অনেক শিক্ষামূলক রচনা ও রম্যরচনা ইংরাজী থেকে বাংলায় অনুবাদও করেন। তিনি বাংলাতে অনুবাদ করেছেন- জনাথন সুইফট এর ‘গালিভার ট্রাভেলস’ এবং আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ‘ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী’।

লেখিকা নিজের আত্মজীবনী লিখেছিলেন এবং শীর্ষক রেখেছিলেন "পাকদণ্ডী '', তাতে তিনি তাঁর শিলঙে কাটানো ছেলেবেলা, শান্তিনিকেতনে কাটানো মুহূর্তগুলো ও অল ইন্ডিয়া রেডিওর সঙ্গে জড়িত কাজকর্ম সহ রায়চৌধুরী পরিবারে ঘটিত নানা মজার ঘটনাগুলি ও বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণিত করেছেন। 

তাঁর লেখা প্রথম গ্রন্থ "বদ্যিনাথের বাড়ি" (১৯৩৯)। 'চীনেলন্ঠন', 'শ্রীমতী', 'জোনাকি', 'আমি নারী', 'হলদে পাখির পালক', 'পাকদণ্ডী', 'পদি পিসির বর্মীবাক্স', 'বাতাস বাড়ি', 'খেরোর খাতা' প্রভৃতি গ্রন্থ তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি। 'বক বধ পালা', 'লঙ্কাদহন পালা,' তাঁর রচিত নাটক গুলির মধ্যে অন্যতম।

শিশুমনের মনোরঞ্জনে উপযুক্ত রস নিহিত করা গল্প ও অ্যাডভেঞ্চারের গল্প তাঁকে জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী লেখিকার স্বীকৃতি দান করেছে। শিশুদের প্রতি তাঁর মনে অন্তর্নিহিত গভীর ভালবাসাই তাঁকে শিশুদের জন্য সরস সাহিত্য রচনার দিকে নিরন্তর অনুপ্রেরণা যোগিয়েছিল। তাঁর রচিত গল্পসম্ভার এর মধ্যে বিশেষ ভাবে জায়গা করে নিয়েছিল পশু ও পাখিদের প্রতি সহ-মর্মিতা, কল্পবিজ্ঞান ভিত্তিক, দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া, এবং শিশুদের মনে থাকা ভয় কে জয় করে নেওয়ার কাহিনি । 

সম্মাননা ও পুরস্কার সমূহ | Honors and awards of Leela Majumdar

তাঁর প্রথম আত্মজীবনী 'আর কোনখানে'-এর জন্য ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্র পুরস্কার পান। এছাড়াও নিজের শিল্প কর্মের জন্য পেয়েছেন বহু পুরস্কার। আনন্দ পুরস্কার, ভারত সরকারের শিশু সাহিত্য পুরস্কার, সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার ( ১৯৫৯ সালে,'বক বধপালা’ নাটকের জন্য), বিদ্যাসাগর পুরস্কার, ভুবনেশ্বরী পদক, ভুবনমোহিনী দাসী সুবর্ণ পদক, দেশিকোত্তম। 

মৃত্যুকাল | Leela Majumdar's passing away

বাংলা সাহিত্যে জগতে শতায়ু লাভ করেছেন দু-একজন লেখক, লীলা মজুমদার তাঁদেরই মধ্যে একজন। শেষ জীবনে প্রায় এক দশক তিনি বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভোগেন, স্মৃতিও লোপ পেতে শুরু করেছিল। কালজয়ী এই শিশু-কিশোর সাহিত্যিক ২০০৭ সালের ৫ এপ্রিল কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্য জগতে তাঁর অবদান অপরসীম। নিজের লেখার দ্বারা তিনি বাংলা সাহিত্য কে নিয়োজিত করে গেছেন অতি উজ্জ্বল স্থানে ।

উপসংহার | Conclusion

প্রখ্যাত লেখিকা লীলা মজুমদার বাংলা সাহিত্যের বড় এক অংশকে এড়িয়ে বিশেষত শিশুদের বেছে নিয়েছিলেন নিজের পাঠক-পাঠিকা হিসাবে। তবে তিনি বড়দের জন্যও রচনা করে গেছেন বেশ কিছু গ্রন্থ। কিন্তু সেইদিকে তাঁর মন তেমন একটা অগ্রসর হয় নি। কিন্তু রায় চৌধুরীর বাড়ির অন্যান্য লেখক ও লেখিকাদের সাথে লীলা মজুমদারের বড় এক পার্থক্য রয়েছে। তাঁর লেখায় প্রকাশ পেয়েছিল অনেক আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শব্দ ব্যাবহারের ক্ষেত্রেও তিনি যথেষ্ট সাহস দেখিয়েছেন। তাঁর লেখাগুলির মধ্যে জীবন্ত ও স্বাভাবিক সংলাপ ছিল। যা শিশু থেকে বড় সকলের মনে জায়গা করে আছে।

প্রশ্নোত্তর - Frequently Asked Questions

লীলা মজুমদার কত সালে জন্মগ্রহণ করেন?

১৯০৮ সালের ২৬ শে ফেব্রুয়ারি।

লীলা মজুমদারের পিতার নাম?

প্রমদারঞ্জন রায়

লীলা মজুমদারের মৃত্যু সাল ?

২০০৭ সাল

নিজের আত্মজীবনী কি নামে লিখেছিলেন ?

পাকদন্ডী

লীলা মজুমদারের স্বামীর নাম কি?

ডাঃ সুধীর কুমার মজুমদার।




পিডিএফ ডাউনলোড | Print or Download PDF File