Sachin Tendulkar | সেঞ্চুরির সেঞ্চুরিই নয়, 'মাস্টার ব্লাস্টারে'র গড়া এমন কিছু রেকর্ড রয়েছে যার ধারের কাছে নেই বিশ্ব ক্রিকেটের কোনও তারকা!

Wednesday, April 24 2024, 8:53 am
highlightKey Highlights

৫১তে পা দিলেন মাস্টার ব্লাস্টার' সচিন তেন্ডুলকর। জানুন সচিনের গড়া কিছু রেকর্ড সম্পর্কে যা আজও বিশ্বক্রিকেটের কোনও তারকা ভাঙতে পারেন নি।


মাত্র ১৬ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখে ঝাঁকড়া চুলের এক ছেলে। পাকিস্তানের মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমে নাকে চোটও পায় সে। সাদা টি-শার্ট ভিজে যায় রক্তে। তবুও সেদিন রক্ত মুছে উঠে দাঁড়ায় ছেলেটি। ১৯৮৯ সালের ওই দিন সেই ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটা গোটা ভারতের মন জিতেছিল। আর সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন অধ্যায়। কেবল ভারতই নয় গোটা বিশ্ব দেখেছিলো ক্রিকেটের মঞ্চে 'ভগবান'-র উত্থান। তবে এক সাধারণ মানুষের ভগবান বা ঈশ্বর হতে লাগে বহুদিনের শ্রম, ইচ্ছা শক্তি এবং হার না মানার জেদ। এতক্ষণে পাঠক হয়তো বুঝে গিয়েছেন কার কথা বলা হচ্ছে। না বুঝে থাকেন তাহলে বলেই দি, ইনি হচ্ছেন 'মাস্টারব্লাস্টার' সচিন তেন্ডুলকর (Sachin Tendulkar)।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সচিনের একশো সেঞ্চুরির ধারের কাছে কেউ নেই। ওডিআই সেঞ্চুরির সংখ্যায় বিরাট কোহলি সচিনকে পেরলেও সব মিলিয়ে ৮০ সেঞ্চুরি কোহলির। এখনও ২০টি সেঞ্চুরি পিছিয়ে বিরাট। এখানেই শেষ নয়, সচিন তেন্ডুলকরের রেকর্ড (sachin tendulkar records) আরও বড়। বর্তমানে বিরাটের মতো আরও ক্রিকেটারদের স্বপ্ন থাকে সচিনের গড়া রেকর্ড ভাঙার। অনেকে সেই স্বপ্ন সফল করলেও এমন বহু রেকর্ড রয়েছে যা এখনও অন্যান্য ক্রিকেটারদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে।  সচিন তেন্ডুলকরের শুভ জন্মদিন (happy birthday sachin tendulkar) উপলক্ষ্যে জেনে নেবো সচিন তেন্ডুলকরের গড়া রেকর্ড সম্পর্কে। তবে তার আগে জেনে নেওয়া যাক সচিনের জীবনী সম্পর্কে সংক্ষেপে।

 সচিন তেন্ডুলকরের জীবনী ।   Biography of Sachin Tendulkar :

১৯৭৩ সালের ২৪শে এপ্রিল নির্মল নার্সিং হোমে  সচিন তেন্ডুলকরের জন্ম। সচিন তেন্ডুলকরের বাবা (sachin tendulkar father) রমেশ তেন্দুলকার এবং সচিন তেন্ডুলকরের মা (sachin tendulkar mother) রজনী তেন্দুলকার। জানা যায়, সচিন তেন্ডুলকরের বাবা (sachin tendulkar father) পেশাগত দিক থেকে একজন মারাঠি ঔপন্যাসিক ছিলেন এবং সচিন তেন্ডুলকরের মা (sachin tendulkar mother) বীমা কোম্পানিতে কাজ করতেন। বিখ্যাত ভারতীয় সুরকার শচীন দেববর্মণের নামানুসারে  সচিন তেন্ডুলকরের নামকরণ করা হয়। ছোটবেলায় সচিন জন ম্যাকেনরোকে আদর্শ করে টেনিস খেলার প্রতি আকৃষ্ট হলেও তাঁর দাদা অজিত ১৯৮৪ সালে সচিনকে দাদরের শিবাজী পার্ক অঞ্চলে বিখ্যাত ক্রিকেট কোচ রমাকান্ত আচরেকরের কাছে নিয়ে যান। আচরেকরের নির্দেশে দাদরের সচিনকে শারদাশ্রম বিদ্যামন্দির উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয় এবং এরপর থেকেই আচরেকর তাঁকে ক্রিকেটে শিক্ষাদান শুরু করেন।

১৯৮৭ সালে মাদ্রাজে এমআরএফ পেস ফাউন্ডেশনে ফাস্ট বোলিং করার প্রশিক্ষণ নিতে গেলে অস্ট্রেলিয়ার দ্রুতগতির ফাস্ট বোলার ডেনিস লিলি সচিনকে ব্যাটিংয়ে মনোনিবেশ করতে বলেন। ওই বছরই ২০শে জানুয়ারি মুম্বইয়ের ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামে ক্রিকেট ক্লাব অব ইন্ডিয়ার সূবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে এক প্রদর্শনী ম্যাচে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানি ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে সচিন পরিবর্তিত খেলোয়াড় হিসেবে প্রথম ম্যাচ খেলেন। এরপর ১৯৮৭ সালের ১৪ই নভেম্বর তেন্দুলকর রঞ্জি ট্রফি প্রতিযোগিতায় মুম্বই ক্রিকেট দলের হয়ে সুযোগ পেলেও প্রথম একাদশে খেলার সুযোগ পাননি। নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট দল ভারত সফর চলাকালীন ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে নেটে প্রশিক্ষণরত ভারতীয় দলের অধিনায়ক কপিল দেবের বলের বিরুদ্ধে ব্যাট করার সুযোগ পেয়ে সচিন সহজেই খেলতে থাকলে মুম্বই ক্রিকেট দলের অধিনায়ক দিলীপ বেঙ্গসরকার তাঁকে মুম্বই দলে প্রথম একাদশে সুযোগ দেন। এরপর ১৯৮৮ সালের ১১ ই ডিসেম্বর মাত্র পনেরো বছর ঘরোয়া প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে মুম্বই ক্রিকেট দলের হয়ে গুজরাত ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ পেয়ে ১০০ রানে অপরাজিত থেকে ভারতের কনিষ্ঠতম ক্রিকেটার হিসেবে অভিষেকে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেট খেলায় শতরানের রেকর্ড করেন সচিন। এরপর তিনি দেওধর ট্রফি ও দিলীপ ট্রফিতেও শতরান করেন।

তেন্দুলকর ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে অকল্যান্ড শহরে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাঁর জীবনের একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম উদ্বোধনে নামেন। এরপর ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই সেপ্টেম্বর শ্রীলঙ্কার কলম্বো শহরে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনি জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক শতরান করেন। ১৯৯৬ ক্রিকেট বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় তিনি দুইটি শতরান করে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে মহম্মদ আজহারউদ্দীনের পর সচিন ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হিসেবে নির্বাচিত হন। কিন্তু তাঁর অধিনায়কত্ব লাভের পর ভারত অস্ট্রেলিয়া সফরে গেলে ০-৩ ফলাফলে পরাজিত হয়। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা ভারত সফরে এসে ভারতকে ২-০ ফলাফলে পরাজিত করলে সচিন অধিনায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেন। ২০০২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে তেন্ডুলকর পোর্ট অব স্পেন টেস্টে তাঁর উনত্রিশতম শতরান করে ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যানের রেকর্ড স্পর্শ করেন। কিন্তু এরপরের ইনিংস গুলো ভালো খেলতে না পারায় ভারত প্রতিযোগিতায় পরাজিত হয়। ২০০২ সালের আগস্ট মাসে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিনি তাঁর ত্রিশতম টেস্ট শতরান করে ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যানের রেকর্ড ভেঙ্গে দেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পরের টেস্ট প্রতিযোগিতায় তিনি অপরাজিত ১৯৪* রান করেন। কনুইয়ের যন্ত্রণায় ২০০৪ সালের বেশিরভাগ সময় সচিন ক্রিকেট খেলতে পারেননি। ২০০৬ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর সুস্থ হয়ে ফিরে এসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে একদিনের ক্রিকেটে অপরাজিত ১৪১* রান করে সচিন তাঁর চল্লিশতম শতরান করেন। ২০০৭ ক্রিকেট বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় ব্যর্থতার পর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেলায় তিনি ওপেন করে প্রতিযোগিতার সেরা হন। এরপরেও তিনি থেমে থাকেননি । ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ম্যাচে বিভিন্ন রেকর্ড করে বারবার নিজেকে বিশ্বের একজন অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে তুলে ধরেছেন সচিন। ২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় ৫৩.৫৫ গড়ে ৪৮২ রান করে শ্রীলঙ্কার তিলকরত্নে দিলশানের পরেই প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় এবং ভারতের সর্বাধিক রান সংগ্রাহক হন তিনি। এই প্রতিযোগিতার ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে পরাজিত করে বিশ্বকাপ জয় করে ভারত। এরপর ২০১২ সালের ১৬ মার্চ তেন্দুলকার ২০১২ এশিয়া কাপ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেলতে নেমে তাঁর শততম শতরান করে বিশ্বরেকর্ড করেন।

তবে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আশানুরূপ খেলতে না পারায় সচিন ২০১২ সালের ২৩শে ডিসেম্বর একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা করেন। এরপর ২০১৩ সালের ১০ই অক্টোবর তেন্দুলকর ২০০তম টেস্ট খেলে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড সেই অনুযায়ী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ঐ বছর নভেম্বর মাসে কলকাতা ও মুম্বই শহরে দুইটি টেস্ট ম্যাচের আয়োজন করে। মুম্বাইতে অনুষ্ঠিত সচিনের ২০০তম টেস্ট ম্যাচে তিনি ৭৪ রান করেন।

সচিন তেন্ডুলকরের রেকর্ড । Sachin Tendulkar Record :

বুধবার, ঘড়ির কাঁটা ২৪ এপ্রিল রাত বারোটা স্পর্শ করতেই  সচিন তেন্ডুলকরের শুভ জন্মদিন (happy birthday sachin tendulkar) উপলক্ষ্যে তাঁকে শুভেচ্চ্ছা জানাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিনন্দনের বন্যা ভেসে যায়। এদিন উঠে আসে সচিনের গড়া রেকর্ডগুলির স্মৃতিচারণের কথাও। মাস্টার ব্লাস্টারের রেকর্ডের কথা বললেই সবার আগে আলোচনায় আসে সেঞ্চুরির কথা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একশো সেঞ্চুরি রয়েছে সচিনের। টেস্টে ৫১ সেঞ্চুরি ও ওয়ান ডে ক্রিকেটে ৪৯ সেঞ্চুরি। কিন্তু সেঞ্চুরির সেঞ্চুরির পাশাপাশি কিংবদন্তির এমন কিছু রেকর্ড আছে, যার ধারেকাছে নেই বিশ্বক্রিকেটের কোনও তারকা।

২০০টি টেস্ট : ২৪ বছরের দীর্ঘ কেরিয়ারে রেকর্ড ২০০টি টেস্ট খেলেছেন সচিন। তাতে ১৫৯২১ রান রয়েছে। যা টেস্টে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা রিকি পন্টিংয়ের মোট টেস্ট রান ১৩৩৭৮। যা সচিনের চেয়ে অনেক পিছিয়ে।

সর্বাধিক টেস্ট উপস্থিতি: ২০০টি টেস্ট ম্যাচ সহ, সচিন তেন্ডুলকর দীর্ঘতম ফর্ম্যাটে সবচেয়ে বেশি ক্যাপ করা আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়। শুধুমাত্র জেমস অ্যান্ডারসন (১৮৭) এই তালিকায় তেন্ডুলকরকে অনুসরণ করেন।

সবচেয়ে বেশি ম্যাচে সেরার স্বীকৃতি : গোটা কেরিয়ারে ৬৩ বার ম্যাচের সেরার স্বীকৃতি পেয়েছেন সচিন। সেটিও একটি রেকর্ড। আর কেউই এতবার ম্যান অফ দ্য ম্যাচের পুরস্কার পাননি। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা শ্রীলঙ্কার সনৎ জয়সূর্য ৪৮ বার ম্যাচের সেরা হয়েছিলেন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশিবার নব্বইয়ের ঘরে আউট : সচিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশিবার নব্বইয়ের ঘরে আউট হয়েছেন। ওয়ান ডে-তে ১৮ বার ও টেস্টে ১০ বার - সব মিলিয়ে ২৮ বার আনলাকি নাইনটিতে ফিরেছেন। তা নাহলে সচিনের সেঞ্চুরির সংখ্যা আরও বাড়ত।

রেকর্ড সংখ্যক মোট ৬ ওয়ান ডে বিশ্বকাপ : ১৯৯২ থেকে ২০১১ - রেকর্ড সংখ্যক মোট ৬ ওয়ান ডে বিশ্বকাপে খেলেছেন সচিন। বিশ্বকাপে ২২৭৮ রান রয়েছে সচিনের। সেটিও সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা রিকি পন্টিংয়ের রয়েছে ১৭৪৩ রান।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একশো সেঞ্চুরি : আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সচিনের একশো সেঞ্চুরির ধারেকাছে কেউ নেই। ওয়ান ডে সেঞ্চুরির সংখ্যায় বিরাট কোহলি সচিনকে পেরলেও সব মিলিয়ে ৮০ সেঞ্চুরি কোহলির। এখনও ২০টি সেঞ্চুরি পিছিয়ে কোহলি।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান : আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সব ফর্ম্যাট মিলিয়ে ৩৪৩৫৭ রান রয়েছে সচিনের। সেটিই সর্বোচ্চ। দুইয়ে রয়েছেন কুমার সঙ্গকারা। যদিও অনেক পিছিয়ে। তাঁর মোট রান ২৮০১৬।

আজও রেকর্ডের খাতায় মলিন সচিন। খেলা ছেড়েছেন অনেক দিন, কিন্তু আজও প্রাসঙ্গিক থেকে গিয়েছেন সচিন তেন্ডুলকর। তাঁর সময়ের তো বটেই, বর্তমান প্রজন্মও তাঁকে আইডল করে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নপূরণের রাস্তায় ছুটে চলেছেন। যতদিন ক্রিকেট থাকবে, ততদিন তিনি হয়ে থাকবেন ক্রিকেটের 'ভগবান'।




পিডিএফ ডাউনলোড | Print or Download PDF File