Raja Subodh Mullick | ক্যামব্রিজ ফেরত যে বিপ্লবী এক ডাকে ১ লাখ টাকা দিয়ে গড়েছিলেন আজকের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়!

Saturday, August 22 2026, 11:33 am
Raja Subodh Mullick | ক্যামব্রিজ ফেরত যে বিপ্লবী এক ডাকে ১ লাখ টাকা দিয়ে গড়েছিলেন আজকের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়!
highlightKey Highlights

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক লড়াই কিংবা সশস্ত্র বিপ্লবের গল্প নয়; এটি ছিল ত্যাগ, শিক্ষা এবং দেশপ্রেমের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। স্বাধীনতা সংগ্রামের বহু মহীরুহকে ইতিহাস সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করলেও, এমন কিছু দূরদর্শী বিপ্লবীর অবদান আজও আড়ালেই রয়ে গেছে। তাঁদের মধ্যেই একজন হলেন রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিক (Raja Subodh Chandra Mullick)। ক্যামব্রিজের পড়াশোনা ছেড়ে এসে যিনি দেশের জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে ১ লক্ষ টাকা দান করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ (Bengal National College)— যা আজকের ঐতিহাসিক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।


ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক লড়াই কিংবা সশস্ত্র বিপ্লবের গল্প নয়; এটি ছিল ত্যাগ, শিক্ষা এবং দেশপ্রেমের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। স্বাধীনতা সংগ্রামের বহু মহীরুহকে ইতিহাস সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করলেও, এমন কিছু দূরদর্শী বিপ্লবীর অবদান আজও আড়ালেই রয়ে গেছে। তাঁদের মধ্যেই একজন হলেন রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিক (Raja Subodh Chandra Mullick)।

ক্যামব্রিজের পড়াশোনা ছেড়ে এসে যিনি দেশের জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে ১ লক্ষ টাকা দান করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ (Bengal National College)— যা আজকের ঐতিহাসিক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

Trending Updates

কে ছিলেন রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিক?

১৮৭৫ সালের ৯ই ডিসেম্বর কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত ও ধনকুবের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সুবোধচন্দ্র মল্লিক। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি জমান ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু বিদেশের বিলাসবহুল জীবন কিংবা নিজের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার তাঁকে খুব বেশিদিন আকর্ষণ করতে পারেনি। পরাধীন ভারতের শৃঙ্খলমোচনের তীব্র তাগিদ তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনে।

দেশে ফিরে তিনি সরাসরি জড়িয়ে পড়েন স্বদেশী ও বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে। অরবিন্দ ঘোষ (শ্রী অরবিন্দ) এবং অন্যান্য বিপ্লবী নেতাদের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর সুসম্পর্ক।

৯ই নভেম্বর ১৯০৫: একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ও 'রাজা' উপাধি

১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন সমগ্র বাংলায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ সরকারের গোলামি শিক্ষাব্যবস্থা বয়কট করে একটি জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা (National Education) গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়ে ওঠে।

১৯০৫ সালের ৯ই নভেম্বর পন্থীর মাঠে (বর্তমান সুবোধ মল্লিক স্কয়ারের কাছে) আয়োজিত এক জনসভায় এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে:

  1. ব্রিটিশ শিক্ষা বয়কটের আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্বদেশী শিক্ষার জন্য একটি তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়।
  2. মঞ্চে দাঁড়িয়ে তরুণ সুবোধচন্দ্র মল্লিক তৎক্ষণাৎ ১ লক্ষ টাকা দানের কথা ঘোষণা করেন (যা তৎকালীন সময়ে এক বিরাট অঙ্কের সম্পত্তি ছিল)।
  3. সুবোধচন্দ্রের এই বিরল দেশপ্রেম ও ত্যাগে মুগ্ধ হয়ে উপস্থিত জনতা ও স্বদেশী নেতারা তাঁকে ভালোবেসে 'রাজা' উপাধিতে ভূষিত করেন।

বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিকের এই বিপুল অর্থ সাহায্য এবং পরবর্তী সময়ে অন্যান্য দানশীল ব্যক্তিদের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (National Council of Education, Bengal)।

  • প্রথম অধ্যক্ষ: জাতীয় শিক্ষা পরিষদের আওতায় ১৯০৬ সালে গঠিত হয় 'বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ'। এর প্রথম অধ্যক্ষ (Principal) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শ্রী অরবিন্দ।
  • শিক্ষকবৃন্দ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের ভাইপো গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, এবং স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দিকপাল ব্যক্তিত্বরা এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
  • পরবর্তী রূপান্তর: স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এই ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশনের ভিত্তির ওপর ভর করেই ১৯৫৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জন্ম নেয় ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (Jadavpur University)।

বিপ্লবী কার্যকলাপে ভূমিকা ও শেষ জীবন

রাজা সুবোধ মল্লিক কেবল অর্থ দিয়েই ক্ষান্ত হননি; স্বদেশী সংবাদপত্র 'বন্দে মাতরম্' প্রকাশের ক্ষেত্রেও তিনি আর্থিক ও নীতিগতভাবে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। বিপ্লবীদের গোপনে অস্ত্র কেনা, রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া এবং স্বদেশী আন্দোলনের প্রচার চালনায় তাঁর অবদান ছিল অতুলনীয়।

ব্রিটিশ সরকার তাঁকে বিপজ্জনক মনে করে ১৯০৮ সালে প্রবিধান ৩ (Regulation III of 1818) অনুযায়ী বিনাবিচারে বন্দি করে আলমোড়া ও পরে বেনারসে নির্বাসিত করে। দীর্ঘ কারাবাস ও মানসিক-শারীরিক নির্যাতনে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে।

মাত্র ৪১ বছর বয়সে (১৯২০ সালের ১৪ই নভেম্বর) এই মহান বিপ্লবীর অকালপ্রয়াণ ঘটে।

ইতিহাস কি তাঁকে ভুলে গেছে?

কলকাতার 'ওয়েলিংটন স্কয়ার' আজ তাঁর স্মরণে 'রাজা সুবোধ মল্লিক স্কয়ার' নামে পরিচিত এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে যাওয়া রাস্তাটি 'রাজা সুবোধ চন্দ্র মল্লিক রোড' নামে চিহ্নিত। তবে দুর্ভাগ্যবশত, আধুনিক ভারতের ইতিহাসে যেভাবে অন্য নেতাদের উদযাপন করা হয়, সেই তুলনায় রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিকের নাম ও ত্যাগের গল্প অনেকাংশেই আড়ালে রয়ে গেছে।

জাতীয় শিক্ষার মাধ্যমে পরাধীন ভারতের তরুণদের স্বাবলম্বী করা এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের সমস্ত ধন-সম্পদ উৎসর্গ করার এই বিরল দৃষ্টান্ত ইতিহাস ও তরুণ প্রজন্মের কাছে এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা।




পিডিএফ ডাউনলোড | Print or Download PDF File