আবহাওয়া

Cyclone Remal | সর্বোচ্চ বেগ ছিল ১২০ কিমি! লাগাতার বৃষ্টির জেরে জলমগ্ন রাস্তা-মেট্রোর লাইন! হয়েছে মৃত্যুও! কতটা তান্ডব চালালো ঘূর্ণিঝড় রেমাল?

Cyclone Remal | সর্বোচ্চ বেগ ছিল ১২০ কিমি! লাগাতার বৃষ্টির জেরে জলমগ্ন রাস্তা-মেট্রোর লাইন! হয়েছে মৃত্যুও! কতটা তান্ডব চালালো ঘূর্ণিঝড় রেমাল?
Key Highlights

ঘূর্ণিঝড় রেমালের জেরে রবিবার রাতে ১৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে শুধু কলকাতাতেই। যার ফলে শহরের অধিকাংশই জলমগ্ন। ব্যাহত হয়ে পরে মেট্রো, রেল, বিমান পরিষেবা। তবে দক্ষিণবঙ্গে কাটতে চলেছে রেমাল-দুর্ভোগ। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়ার দাপট কমবে।

পূর্বাভাস অনুযায়ী রবিবার থেকেই ধীরে ধীরে দাপট দেখাতে শুরু করে রেমাল ঘূর্ণিঝড় (Remal Cyclone)। এই সাইক্লোনের জেরে জলমগ্ন গোটা কলকাতা শহর। একাধিক এলাকায় ব্যাহত যান চলাচল। শুধু কলকাতাই নয়, সুন্দরবন, দুই ২৪ পরগনাতেও চলেছে লাগাতার বৃষ্টি।  রেমালের প্রভাবে আজও দক্ষিণববঙ্গ জুড়ে ভারী বৃষ্টি চলবে বলে পশ্চিমবঙ্গ আবহাওয়া রিপোর্ট (West Bengal Weather Report) অনুযায়ী খবর। ইতিমধ্যে নদিয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির লাল সতর্কতা জারি হয়েছে। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, দুই ২৪ পরগনা, পূর্ব বর্ধমান ও বীরভূমে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। তবে ঘূর্ণিঝড় আপডেট (cyclone update) অনুযায়ী, বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়ার দাপট কমবে। 

সাইক্লোন রেমালের পরিস্থিতি :

ঘূর্ণিঝড় আপডেট (cyclone update) অনুযায়ী জানা গিয়েছে, এই মুহূর্তে রেমাল ঘূর্ণিঝড় (Remal Cyclone) এগোচ্ছে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব অভিমুখে। রবিবার রাতেই ঘূর্ণিঝড় রেমাল ল্যান্ডফল করেছে আর তার প্রভাব পড়েছে শহর ও জেলার বিভিন্ন জায়গায়। রেমাল নামটি ওমানের দেওয়া। আরবি ভাষায় এই শব্দের অর্থ ‘বালি’। রেমালের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১১০ কিলোমিটার। সাময়িক সর্বোচ্চ বেগ ছিল ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার। ঘূর্ণিঝড়ের জেরে কলকাতায় ঘণ্টায় ৭৪ কিলোমিটার বেগে বইল ঝোড়ো হাওয়া। রবিবার সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ উত্তর বঙ্গোপসাগরের উপর দিয়ে উত্তর দিকে এগিয়ে যায় রেমাল। রেমাল তখন পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপের ১৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে, ক্যানিংয়ের ১৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্বে, বাংলাদেশের মোংলা থেকে ২২০ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং বাংলাদেশের খেপুপাড়ার ১৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে ছিল ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান। 

জানা গিয়েছে, সাগরে শক্তি বাড়িয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে রবিবার রাত ১২টা নাগাদ ঘূর্ণিঝড় রেমালের ‘চোখ’ ঢুকে পড়ে স্থলভাগে। বাংলাদেশের খেপুপাড়া এবং পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপের মাঝখান দিয়ে স্থলভাগে প্রবেশ করে প্রবল ঘূর্ণিঝড় হিসাবে বাংলাদেশের মোংলার দক্ষিণ-পশ্চিমে আছড়ে পড়ে রেমাল। ল্যান্ডফলের গোটা প্রক্রিয়াটি প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে চলে। আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানায়, রাত ১২টা নাগাদ রেমালের ল্যান্ডফল শেষ হয়। তখন নদিয়া এবং পূর্ব বর্ধমানে ঝড়ের গতি ৬০-৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছিল বলে হাওয়া অফিস সূত্রে খবর। তবে এই গতি বেড়ে ৮০ কিলেমিটার পর্যন্তও ছুঁয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণের বাকি জেলাগুলিতেও ৫০-৬০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বয়েছে। তবে দক্ষিণবঙ্গে কাটতে চলেছে রেমাল-দুর্ভোগ। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়ার দাপট কমবে। 'ল্যান্ডফলের' পর শক্তি হারিয়েছে রেমাল। এই মুহূর্তে তা ঘূর্ণিঝড় হয়ে এগোচ্ছে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব অভিমুখে।

পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়া : 

ঘূর্ণিঝড় রেমালের জেরে উত্তাল পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়া (West Bengal Weather)। হাওয়া অফিস জানিয়েছে, রাতে ১৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে শুধু কলকাতাতেই। প্রভাবে সোমবারও ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে কলকাতায়। পশ্চিমবঙ্গ আবহাওয়া রিপোর্ট (West Bengal Weather Report) অনুযায়ী, আট জেলায় জারি হয়েছে কমলা সতর্কতা। সোমবার রাজ্যের দুই জেলায় লাল সতর্কতাও জারি রয়েছে। মুর্শিদাবাদ এবং নদিয়ায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। ঝড়ের গতি থাকতে পারে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার। সাময়িক ভাবে দমকা হাওয়ার বেগ পৌঁছে যেতে পারে ৮০ কিলোমিটার পর্যন্তও। এই দুই জেলায় সোমবার ৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। হাওয়া অফিস জানিয়েছে, সোমবার কলকাতা ছাড়াও হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান এবং বীরভূমে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এই জেলাগুলিতে ঝড়ের গতি থাকতে পারে ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত। তবে মঙ্গলবার থেকে বদলাবে পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়া (West Bengal Weather)। দুর্যোগ কাটতে পারে দক্ষিণবঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গ আবহাওয়া রিপোর্ট (West Bengal Weather Report) অনুযায়ী, সোমবারের পর থেকেই বৃষ্টি কমবে। মঙ্গল থেকে আপাতত দক্ষিণের কোনও জেলাতেই ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। 

সাইক্লোন রেমালের তান্ডব!

ঘূর্ণিঝড় রেমালের জেরে সপ্তাহের প্রথম দিনই ঝড়-বৃষ্টিতে জনজীবন প্রায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। শহরের একাধিক জায়গায় জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। 'রেমাল'-র প্রভাবে কলকাতার বিস্তীর্ণ অংশ জলভাসি। সিঁথির মোড় থেকে বেহালা, বালিগঞ্জ, ক্যামাক স্ট্রিট, জলের তলায়। রেহাই পায়নি সল্টলেকও। সল্টলেকের AA ব্লক, AC ব্লক, FD ব্লক-সহ বিভিন্ন জায়গায় গাছ উপড়ে পড়ায় রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। যাতায়াতে সমস্যায় পড়েছেন এখানকার বাসিন্দারা। ঘুরপথে যাতায়াত করতে হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ কেটে গেলেও পুরসভার তরফে রাস্তা পরিষ্কার না হওয়ায় ক্ষুব্ধ সল্টলেকের বাসিন্দারা। AC ব্লকের ২৮ নম্বর বাড়ির সামনে গাছ ভেঙে বিপত্তি। ল্যাম্পপোস্ট আর বাড়ির বিপজ্জনকভাবে হেলে পড়েছে গাছ। অন্যদিকে, রেমালের তাণ্ডবে সুন্দরবনের উপকূলের এলাকা কার্যত তছনছ। প্রবল বৃষ্টি, ঝড়ে লণ্ডভণ্ড। বহু কাঁচাবাড়ি ভেঙে পড়েছে, দোকানের ছাউনি উড়ে গিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে রবিবার রাত পর্যন্ত ১ লক্ষ ১০ হাজার মানুষকে ত্রাণ শিবিরে তুলে আনা হয়েছে। 

রেমালের জেরে মৃত্যু : রেমালের দাপট তোলপাড় করেছে উপকূলকে। সেই দুর্যোগের প্রাণ হারালেন এক বৃদ্ধা। সোমবার সকালে প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে হাওয়ার দাপটে গাছ ভেঙে পড়ে ওই বৃদ্ধার বাড়িতে। এরপরই বাড়ি ধসে মৃত্যু হয় রেণুকা মণ্ডল নামে ৮০ বছর বয়সি মহিলার। কলকাতাতেও বিপজ্জনক বাড়ির অংশ ভেঙে একজনের মৃত্যু হয় রবিবার। এই নিয়ে রেমালের দুর্যোগ ২ জনের প্রাণ কাড়ল। 

 ঝড়-বৃষ্টিতে জনজীবন প্রায় স্তব্ধ : সপ্তাহের প্রথম দিনেই এই ঝড়-বৃষ্টিতে জনজীবন প্রায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় রাত থেকেই বৃষ্টি এবং ঝোড়ো হাওয়া বইছে। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন জায়গায় কারেন্ট চলে গিয়েছে। সিইএসসি দাবি করেছে যে বিপদ এড়াতে সেই কাজ করা হয়েছে। সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডবে জল জমে গিয়েছে আলিপুরে। রাস্তায় উপড়ে পড়ে আছে গাছ। কিছু-কিছু অংশে জলও জমেছে। মেয়র ফিরহাদ হাকিমের দাবি, কলকাতায় ছোট বড় মিলিয়ে মোট ৫৮টি গাছ ভেঙে পড়েছে। যদিও গাছ সরিয়ে রাস্তা ফাঁকা করার কাজ চলছে। হাওড়ার রামরাজাতলা, সাঁতরাগাছি-সহ বিভিন্ন জায়গায় জল জমে রয়েছে। সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে নিত্যযাত্রীদের। 

মেট্রো পরিষেবায় বিভ্রাট : ঘূর্ণিঝড় রেমালের জেরে রাতভর বৃষ্টিতে সপ্তাহের প্রথম দিনে বিপর্যস্ত কলকাতার মেট্রো পরিষেবা। পার্ক স্ট্রিট এবং এসপ্ল্যানেড মেট্রো স্টেশনের মাঝের ট্র্যাকে জল ঢুকে পড়েছে। ফলে সোমবার সাতসকাল থেকেই ব্যাহত মেট্রো পরিষেবা। জানা গিয়েছে, জল জমার কারণে গিরিশ পার্ক থেকে টালিগঞ্জ পর্যন্ত মেট্রো পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ। আপ, ডাউন কোনও দিকেই মেট্রো চলছে না ওই অংশে। সকাল ৭টা ৫১ মিনিট থেকে মেট্রো পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে।  তবে টালিগঞ্জ থেকে কবি সুভাষ এবং গিরিশ পার্ক থেকে দক্ষিণেশ্বর পর্যন্ত মেট্রো চলাচল করছে। দ্রুত পরিষেবা স্বাভাবিক করার কাজ চলছে। ট্র্যাক থেকে জল বার করার কাজ করছেন মেট্রো কর্মীরা। ঘটনাস্থলে রয়েছেন মেট্রোর উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা। 

ব্যাহত ট্রেন পরিষেবা : সাইক্লোনের দাপটে ট্রেন পরিষেবাও ব্যাহত। ঘূর্ণিঝড় রেমালের দুর্যোগের জেরে রবিবার রাত ১১টার পর থেকেই কার্যত থমকে যায় শিয়ালদা দক্ষিণ শাখার ট্রেন পরিষেবা। শিয়ালদা দক্ষিণ শাখায় বিভিন্ন স্টেশনে দাঁড়িয়ে পড়ে একের পর এক ট্রেন। আজ, সোমবার সকালেও একাধিক ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। প্রাথমিকভাবে সকাল ৬টা পর্যন্ত ট্রেন বন্ধ থাকবে বলে জানা গিয়েছিল। কিন্তু শিয়ালদা সাউথ সেকশনে একাধিক জায়গায় গাছ ভেঙে পড়ে লাইনের উপরে। যার জেরে সকাল ৬টাতেও ট্রেন চালু করা সম্ভব হয়নি । শিয়ালদহের দক্ষিণ শাখায় সকাল থেকে ট্রেন বন্ধ ছিল। তবে সাড়ে ৯টার পর থেকে ধীরে ধীরে ওই শাখায় ট্রেন চলাচল শুরু করেছে। তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। শিয়ালদহের উত্তরে হাসনাবাদ শাখায় এখনও ট্রেন পরিষেবা বন্ধ।

প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর চালু কলকাতা বিমানবন্দরের বিমান পরিষেবা : ঘূর্ণিঝড়ের জেরে রবিবার বেলা ১২টা থেকে বন্ধ ছিল কলকাতা বিমানবন্দরের বিমান পরিষেবা।  সোমবার সকাল ৮টা ৫৯ মিনিটে চালু হয়ে যায় বিমান ওঠানামার প্রক্রিয়া। তবে এখন পর্যন্ত যা জানা গিয়েছে, সেই অনুযায়ী প্রায় ৪০০ উড়ান বাতিল করা হয়েছে। ফলে পরিষেবা স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে বলেই বিমানবন্দর সূত্রে খবর। 

ঘূর্ণিঝড় রেমালের জেরে রবিবার থেকেই দফায় দফায় চলছে বৃষ্টি। সোমবার সকাল থেকে একবারও থামেনি বৃষ্টি। দিনভর কলকাতায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সঙ্গে বইছে দমকা ঝোড়ো হাওয়া। সেক্ষেত্রে তুলনামূলক নিচু এলাকায় জলযন্ত্রণা থেকে এখনই রেহাই পাওয়া কার্যত দুষ্কর। তবে বিকেলের পর থেকে আবহাওয়া কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে আশ্বাস হাওয়া অফিসের। কমতে পারে বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার দাপট।