Sarat Chandra Basu | "সুভাষের চেয়েও দাদা বেশি বিপজ্জনক!" জানুন শরৎচন্দ্র বসুর অজানা ইতিহাস ও বীরত্বের কাহিনী!

Key Highlightsভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বর্ণালী ইতিহাসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নাম শোনেননি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু এই দেশনায়কের সাহসিকতা ও সংগ্রামের পেছনে যিনি বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়েছিলেন, সেই মেজদা শরৎচন্দ্র বসু (Sarat Chandra Bose)-র নাম কি আমরা যথোপযুক্ত মর্যাদায় মনে রেখেছি? তৎকালীন কলকাতার কুখ্যাত ব্রিটিশ পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ট একবার গোয়েন্দা রিপোর্টে স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন— "সুভাষের চেয়েও তাঁর দাদা শরৎচন্দ্র বসু ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের জন্য অনেক বেশি বিপজ্জনক।" আইনজীবীর কালো পোশাকের আড়ালে তিনি ছিলেন ভারতের বহু বিপ্লবীর আসল আশ্রয়দাতা। আদালতে অকুতোভয় আইনি লড়াই থেকে শুরু করে গোপনে বিপ্লবীদের সাহায্য করা—সবকিছুর নেপথ্যে ছিলেন এই একলা পথচলা নির্ভীক বীর।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বর্ণালী ইতিহাসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নাম শোনেননি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু এই দেশনায়কের সাহসিকতা ও সংগ্রামের পেছনে যিনি বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়েছিলেন, সেই মেজদা শরৎচন্দ্র বসু (Sarat Chandra Bose)-র নাম কি আমরা যথোপযুক্ত মর্যাদায় মনে রেখেছি?
তৎকালীন কলকাতার কুখ্যাত ব্রিটিশ পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ট একবার গোয়েন্দা রিপোর্টে স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন— "সুভাষের চেয়েও তাঁর দাদা শরৎচন্দ্র বসু ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের জন্য অনেক বেশি বিপজ্জনক।"
আইনজীবীর কালো পোশাকের আড়ালে তিনি ছিলেন ভারতের বহু বিপ্লবীর আসল আশ্রয়দাতা। আদালতে অকুতোভয় আইনি লড়াই থেকে শুরু করে গোপনে বিপ্লবীদের সাহায্য করা—সবকিছুর নেপথ্যে ছিলেন এই একলা পথচলা নির্ভীক বীর।

কেন ব্রিটিশ রাজের চোখে এত ভয়ঙ্কর ছিলেন শরৎচন্দ্র?
শরৎচন্দ্র বসু ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের তৎকালীন সময়ের অন্যতম সফল ও প্রভাবশালী ব্যারিস্টার। তাঁর বিশাল পশারি ও রোজগার ছিল, যা দিয়ে তিনি রাজকীয় জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু তাঁর আসল অগ্রাধিকার ছিল ভারতের স্বাধীনতা।
ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগের নজর এড়িয়ে তিনি যেভাবে বিপ্লবী আন্দোলনকে সাহায্য করতেন, তা সত্যিই রোমাঞ্চকর:
- বিনামূল্যে রাজবন্দীদের আইনি প্রতিরক্ষা: রাজদ্রোহের মামলায় অভিযুক্ত অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর দল কিংবা অন্য যেকোনো বিপ্লবী গোষ্ঠীর নেতাদের পক্ষে আদালতে লড়তে তিনি এক পয়সাও ফি নিতেন না।
- আদালতের ঘরে গোপন কাজ: আইনজীবী হিসেবে তাঁর বিশেষ অধিকারকে কাজে লাগিয়ে তিনি কারাবন্দী বিপ্লবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। আদালতের ভেতরে ব্রিফকেসে করে গোপন নথি, বার্তা এবং বহু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আদান-প্রদান করতেন।
- বিপ্লবীদের গোপন আর্থিক ফান্ড: ব্যারিস্টারি থেকে অর্জিত উপার্জনের বড় একটি অংশ তিনি তুলে দিতেন সশস্ত্র বিপ্লবীদের হাতে, যাতে তাঁরা অস্ত্র ও রসদ জোগাড় করতে পারেন।
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলা ও বিপ্লবীদের মৃত্যুদণ্ড রোধ
১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন (Chittagong Armoury Raid) আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। মাস্টারদা সূর্য সেনের অনুগামী তরুণ বিপ্লবীদের ফাঁসিকাঠে ঝোলানোর জন্য ইংরেজ সরকার মরিয়া হয়ে ওঠে।
সেই চরম সংকটময় মুহূর্তে সমস্ত সরকারি ভয়ভীতি উপেক্ষা করে সামনে আসেন শরৎচন্দ্র বসু।
- তিনি স্বয়ং স্পেশাল ডিফেন্স কমিটির নেতৃত্ব নেন এবং প্রখ্যাত আইনজীবীদের নিয়ে একটি শক্তিশালী প্যানেল তৈরি করেন।
- চট্টগ্রাম ট্রাইব্যুনালে নিখুঁত আইনি যুক্তি ও তথ্যের মাধ্যমে ব্রিটিশ বিচারকদের কোণঠাসা করে দেন।
- তাঁর অসাধারণ বিচক্ষণতার কারণেই অম্বিকা চক্রবর্তী, অনন্ত সিংহ, লোকনাথ বলের মতো বহু তরুণ বীরের নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসির রায় বদলে গিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।
শরৎচন্দ্রের এই প্রভাবে আতঙ্কিত হয়ে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩২ সালে ‘ভারত রক্ষা আইন’ (Defence of India Act)-এর অপব্যবহার করে তাঁকে কোনো বিচার ছাড়াই দীর্ঘ চার বছর কারারুদ্ধ করে রাখে।

নেতাজির ‘মহানিষ্ক্রমণ’ ও শরৎচন্দ্রের মাস্টারপ্ল্যান
১৯৪১ সালে অ্যালগিন রোডের বাড়ি থেকে সুভাষচন্দ্র বসুর ঐতিহাসিক অন্তর্ধান—যা ইতিহাসে ‘মহানিষ্ক্রমণ’ নামে পরিচিত—তার নেপথ্য পরিচালক ছিলেন শরৎচন্দ্র বসু।
উডবার্ন পার্ক ও অ্যালগিন রোডের বাসভবনে ইংরেজ গোয়েন্দাদের চব্বিশ ঘণ্টার কড়া নজরদারি ছিল। সেই নজরদারি এড়িয়ে কীভাবে সুভাষচন্দ্র ছদ্মবেশ ধারণ করবেন, কীভাবে কলকাতা ছাড়বেন এবং কীভাবে বিদেশে পৌঁছে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করবেন—তার সূক্ষ্ম ছক সাজিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র। শুধু পরিকল্পনাই নয়, এই অভিযানের যাবতীয় আর্থিক সংস্থানও তিনি নিঃশব্দে নিশ্চিত করেছিলেন।
স্বাধীন অখণ্ড বাংলা ও ইতিহাসের অবিচার
১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় যখন বাংলা দ্বিখণ্ডিত হওয়ার মুখে, তখন শরৎচন্দ্র বসু এবং হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মিলে ‘স্বাধীন অখণ্ড বাংলা’ (United Bengal movement) গড়ার ঐতিহাসিক প্রস্তাব এনেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন বাংলা যেন নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে এবং অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু না হয়ে পড়ে। কিন্তু রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের জটিলতায় তাঁর সেই প্রয়াস সফল হয়নি।
পরবর্তীকালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (INA)-র বন্দীদের মুক্তি আন্দোলনেও তিনি প্রধান ভূমিকা নেন। অথচ স্বাধীনতার পর রাজনীতির আলো থেকে তিনি বহু দূরে সরে যান।

সুভাষচন্দ্র বসু যদি হন স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রদীপের উজ্জ্বল শিখা, তবে শরৎচন্দ্র বসু ছিলেন সেই প্রদীপের সলতে ও তেল—যিনি নীরব আত্মত্যাগে নিজেকে জ্বালিয়ে ভারতের স্বাধীনতার পথকে সুগম করেছিলেন। ইতিহাস হয়তো তাঁকে যোগ্য সম্মান দিতে ভুল করেছে, কিন্তু তাঁর অবিস্মরণীয় অবদান ভারতের মুক্তিসংগ্রামে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।
- Related topics -
- ভারতের গর্ব
- ভারত
- নেতাজি
- নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস









