Durga Puja 2026 | পদ্মের অভাবে নিজের চোখ উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন রাজপুত্র রাম! একনজরে রামায়ণের অকালবোধন থেকে সন্ধিপুজোর মাহাত্ম্য

Tuesday, October 20 2026, 8:26 am
Durga Puja 2026 | পদ্মের অভাবে নিজের চোখ উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন রাজপুত্র রাম! একনজরে রামায়ণের অকালবোধন থেকে সন্ধিপুজোর মাহাত্ম্য
highlightKey Highlights

সন্ধিপুজোর ১০৮ প্রদীপ ও ১০৮ পদ্মের নেপথ্যে রয়েছে রামায়ণের বহুল প্রচলিত অকালবোধনের কাহিনি। কৃত্তিবাসী রামায়ণের আখ্যান অনুযায়ী, রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ের আশায় রাম শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন। পূজার সময় একটি নীলপদ্ম কম পড়ায় তিনি নিজের চোখ উৎসর্গ করতে উদ্যত হন। তাঁর ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে দেবী তাঁকে আশীর্বাদ করেন। অন্যদিকে, অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে চণ্ড ও মুণ্ড বধের পৌরাণিক কাহিনি সন্ধিপুজোর মাহাত্ম্যকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। ১০৮টি প্রদীপের আলো তাই শুধু ধর্মীয় আচার নয়, ভক্তি, আত্মনিবেদন এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয়ের প্রতীক।


একটি পদ্ম কম পড়েছিল। দেবীর আরাধনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে এই আশঙ্কায় নিজের চোখ উৎসর্গ করতে উদ্যত হয়েছিলেন রঘুকুলের রাজপুত্র রাম। রামায়ণের সেই বহুল প্রচলিত কাহিনি, অকালবোধনের বিশ্বাস আর অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণ মিলিয়েই বাঙালির দুর্গোৎসবে সন্ধিপুজো বিশেষ মাহাত্ম্য পেয়েছে।

ঢাকের আওয়াজ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। ধূপের ধোঁয়ায় ভরে উঠেছে ঠাকুরদালান। পুরোহিত মন্ত্র পড়ছেন, আর মণ্ডপের এক কোণে পরিবারের ছোট্ট মেয়েটি ঠাকুমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে দেখছে সারি সারি প্রদীপ সাজানোর দৃশ্য। তার চোখে কৌতূহল—কেন এই পুজোয় ঠিক ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানো হয়? কেনই বা পদ্মফুলের সংখ্যা ১০৮?

যুদ্ধের আগে দেবীর শরণে রাম

লঙ্কার যুদ্ধ তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। সামনে দশানন রাবণ। তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত মানব রামচন্দ্র। কিন্তু এই যুদ্ধ কেবল দুই বীরের লড়াই নয়—এ আসলে ন্যায় ও অন্যায়ের সংঘাত, সীতাকে উদ্ধার করার সংকল্প এবং অধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতিজ্ঞা।

প্রচলিত বাংলা রামায়ণ-পরম্পরায়, কৃত্তিবাসী রামায়ণের জনপ্রিয় আখ্যানে, এই সংকটের সময় যুদ্ধের যাওয়ার আগে রাম দেবী দুর্গার আরাধনা করার সিদ্ধান্ত নেন। দেবীর পূজার উপযুক্ত সময় বসন্তকাল। তবে যুদ্ধের প্রয়োজনে শরতেই তাঁকে আহ্বান করেন রাম। অসময়ে দেবীকে জাগিয়ে পূজা করার এই আয়োজনই অকালবোধন নামে পরিচিত। অস্ত্র হাতে যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার আগে তিনি দেবীর সামনে নত হলেন।

একটি পদ্ম কম! রামের ভক্তির কঠিন পরীক্ষা

দেবীর পূজায় প্রয়োজন ১০৮টি নীলপদ্ম। রাম সমস্ত আয়োজন করলেন। একে একে দেবীর চরণে নিবেদন করা হতে লাগল পদ্মফুল। কিন্তু পূজার শেষ মুহূর্তে দেখা গেল, একটি পদ্ম কম। এত আয়োজন, এত প্রার্থনা—অথচ শেষ মুহূর্তে একটি ফুলের অভাব। পূজা কি তবে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে? দেবীর আশীর্বাদ ছাড়া রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয় অনিশ্চিত। কৃত্তিবাসী রামায়ণের জনপ্রিয় কাহিনিতে রাম তখন নিজের নামের অর্থের দিকেই যেন ফিরে তাকালেন। তাঁকে বলা হয় ‘পদ্মলোচন’— তাঁর চোখ পদ্মের মতো সুন্দর। একটি পদ্মের অভাব পূরণ করার জন্য তিনি নিজের একটি চোখই দেবীর চরণে নিবেদন করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

দেবীর সামনে তাঁর কাছে আর কোনো বিকল্প নেই। তীর তাক করে রাম যখন নিজের চোখ উৎসর্গ করতে যাচ্ছেন, তখন তাঁর ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে আবির্ভূত হলেন স্বয়ং দেবী দুর্গা। রামের নিষ্ঠা ও আত্মনিবেদনে সন্তুষ্ট হয়ে দেবী তাঁকে আশীর্বাদ করেন দিগ্বিজয়ের।

এই কাহিনির আসল সৌন্দর্য অলৌকিক ঘটনায় যতটা, তার চেয়ে বেশি রামের মানসিকতায়। তাঁর কাছে দেবী আরাধনা শুধু ফুল, মন্ত্র কিংবা নিয়ম পালনের বিষয় ছিল না। প্রার্থনার অর্থ ছিল নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করা। এখানেই ১০৮টি নীলপদ্মের গল্প বাঙালির মনে এত গভীর ছাপ ফেলেছে। ভক্তির মাপকাঠি যে বাহ্যিক আয়োজন নয়, বরং অন্তরের নিষ্ঠা এই আখ্যান সেই কথাই বলে।

অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণ: যখন সময়ও হয়ে ওঠে পবিত্র

রামের অকালবোধনের গল্প থেকে এবার ফিরে আসা যাক দুর্গাপুজোর আরেক গুরুত্বপূর্ণ পৌরাণিক মুহূর্তে—সন্ধিপুজোয়। অষ্টমী শেষ হচ্ছে, নবমী আসছে। পঞ্জিকার হিসাবে এই দুই তিথির সংযোগকালই সন্ধিক্ষণ। প্রচলিত দুর্গাপুজোর আচার অনুযায়ী, এই সময়েই অনুষ্ঠিত হয় সন্ধিপুজো। অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমীর প্রথম ২৪ মিনিট মিলিয়ে মোট ৪৮ মিনিটকে সাধারণত এই পূজার সময় হিসেবে ধরা হয়। তবে প্রকৃত সময় নির্ধারিত হয় সংশ্লিষ্ট দিনের পঞ্জিকা অনুযায়ী।

এই সন্ধিক্ষণের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অসুরবিনাশী দেবী দুর্গার চণ্ড ও মুণ্ড নামে দুই অসুরের বধের কাহিনি। তাই সন্ধিপুজোয় দেবীকে শুধু মাতৃরূপে নয়, অশুভ বিনাশকারী মহাশক্তি হিসেবেও আরাধনা করা হয়। এখানে ‘সন্ধি’ শব্দটির তাৎপর্য যেন আরও গভীর। একটি তিথি শেষ হচ্ছে, অন্যটি শুরু হচ্ছে। একটি মুহূর্ত বিদায় নিচ্ছে, আরেকটি মুহূর্তের জন্ম হচ্ছে। এই পরিবর্তনের মধ্যেই রয়েছে পুরনো অন্ধকার থেকে নতুন আলোর দিকে যাওয়ার প্রতীকী বিবরণ।

১০৮ প্রদীপ: অন্ধকারের বিরুদ্ধে একশো আটটি শিখা

এবার সেই ছোট্ট মেয়েটির কথায় ফিরে আসা যাক, যে ঠাকুমার পাশে দাঁড়িয়ে প্রদীপ সাজানো দেখছিল। একটি একটি করে প্রদীপে তেল দেওয়া হচ্ছে, সলতে ঠিক করা হচ্ছে। তারপর নির্দিষ্ট মুহূর্তে জ্বলে উঠছে শিখাগুলি। মণ্ডপ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে প্রতিনিয়ত। হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরায় ১০৮ সংখ্যাটি বিশেষ পবিত্রতার প্রতীক। জপমালার ১০৮টি দানা থেকে দেবদেবীর ১০৮ নাম, বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে এই সংখ্যার ব্যবহার দেখা যায়। সন্ধিপুজোতে ১০৮টি প্রদীপের আলো ভক্তি, পূর্ণতা এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয়ের প্রতীক।

তাই বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালান হোক কিংবা পাড়ার বারোয়ারি মণ্ডপ—সন্ধিপুজোর সময় ১০৮ প্রদীপের আলোয় মানুষ শুধু দেবীকে দেখেন না। তাঁরা খুঁজে পান নিজেদের বিশ্বাস, শৈশবের স্মৃতি, পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।

শেষ প্রদীপের আলোয় যে গল্প বেঁচে থাকে

পুজো শেষ হলে প্রদীপের শিখাগুলি একসময় নিভে যাবে। পদ্মফুলগুলিও ধীরে ধীরে শুকিয়ে আসবে। ঢাকের আওয়াজ থামবে, মণ্ডপের ভিড় কমবে। কিন্তু রামের সেই অসমাপ্ত পদ্মের গল্প থেকে যাবে মানুষের মনে। হয়তো পরের বছর সন্ধিপুজোর সময় আবার কোনো শিশু প্রশ্ন করবে, “১০৮টা প্রদীপ কেন জ্বালানো হয়?” কোনো প্রবীণ তখন আবার গল্প শুরু করবেন—তিনি বলবেন এক রাজপুত্রের কথা, যিনি যুদ্ধের আগে দেবীর শরণ নিয়েছিলেন। একটি পদ্মের অভাব পূরণ করতে নিজের চোখ উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন; আর মাতৃময়ী দেবী ভক্তির গভীরতায় সাড়া দিয়েছিলেন। দিয়েছিলেন দিগ্বিজয়ের বরদান।




পিডিএফ ডাউনলোড | Print or Download PDF File