Durga Puja 2026 | নবমী নিশি ও রাজকীয় ভূরিভোজ: বাঙালি খাদ্যসংস্কৃতিতে নবমীর স্বাদ ও ইতিহাস!

Key Highlightsশরতের শেষভাগে ঢাকের কাঠি যখন আরও দ্রুত তালে বাজতে শুরু করে, তখন মণ্ডপে মণ্ডপে নেমে আসে এক মিশ্র অনুভূতি। একদিকে উৎসব শেষের বিষাদ, অন্যদিকে নবমী (navami) নিশির বাঁধভাঙা উল্লাস। দুর্গাপুজো (durga puja festival) মানেই কেবল আলোকসজ্জা বা প্রতিমা দর্শন নয়, বাঙালির কাছে এই চার দিন হলো রসনাতৃপ্তির এক মহা-উৎসব। তবে ষষ্ঠী, সপ্তমী ও অষ্টমীর আচারের পর মহানবমীর ভোজে যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তা বাঙালি খাদ্যসংস্কৃতির এক অনন্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শন।
শরতের শেষভাগে ঢাকের কাঠি যখন আরও দ্রুত তালে বাজতে শুরু করে, তখন মণ্ডপে মণ্ডপে নেমে আসে এক মিশ্র অনুভূতি। একদিকে উৎসব শেষের বিষাদ, অন্যদিকে নবমী (navami) নিশির বাঁধভাঙা উল্লাস। দুর্গাপুজো (durga puja festival) মানেই কেবল আলোকসজ্জা বা প্রতিমা দর্শন নয়, বাঙালির কাছে এই চার দিন হলো রসনাতৃপ্তির এক মহা-উৎসব। তবে ষষ্ঠী, সপ্তমী ও অষ্টমীর আচারের পর মহানবমীর ভোজে যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তা বাঙালি খাদ্যসংস্কৃতির এক অনন্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শন।

নিরামিষ থেকে আমিষ: এক ঐতিহাসিক রূপান্তর-শারদীয় পূজার শুরুর দিনগুলোতে অর্থাৎ সপ্তমী বা অষ্টমীতে অধিকাংশ বাড়িতে কিংবা মণ্ডপে সম্পূর্ণ নিরামিষ আহার বা ভোগের আয়োজন করা হলেও, নবমীতে চিত্রটা পুরোপুরি বদলে যায়। মহানবমীর দিন পশুবলি বা প্রতীকী বলির পর দেবী দুর্গাকে 'বলিপ্রদত্ত মাংস' অর্পণের এক প্রাচীন প্রথা রয়েছে। শাস্ত্রমতে, এই বলির মাংস থেকেই জন্ম নেয় নবমীর বিশেষ আমিষ ভোগের ঐতিহ্য।অতীতে জমিদারবাড়ি ও রাজবাড়ির পূজায় নবমীর দিন পাঁঠা বলির পর পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া কেবল আদা, জিরে, ঘি ও গরম মশলা দিয়ে তৈরি হতো পাত্রে রাখা মাংস—যা 'বলির পাঁঠার মাংস' বা নিরামিষ মাংস নামে পরিচিত ছিল। সময়ের সাথে সাথে বলির প্রথা অনেক কমে গেলেও, নবমীর দিন পাঁঠার মাংস বা বিশেষ আমিষ পদ খাওয়ার এই রেওয়াজ বাঙালি পরিবারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়ে গেছে।
নবমী ভোগ: প্রসাদ থেকে রাজকীয় থালী!
মণ্ডপ কিংবা পারিবারিক ঠাকুরদালানে নবমী ভোগ (Navami Bhog)-এর আয়োজন থাকে চোখে পড়ার মতো। বৈষ্ণব ও শক্তি—এই দুই ঐতিহ্যের মিলনে নবমীর ভোজে বৈচিত্র্য দেখা যায়:শক্তি ঐতিহ্য (আমিষ ভোগ): কোনো কোনো ঐতিহ্যবাহী পুজোয় দেবীকে রুই মাছ, পাঁঠার মাংস কিংবা ইলিশ মাছ নিবেদন করা হয়। পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া তৈরি এই পদের স্বাদ ও সুগন্ধ সাধারণ রান্নার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
বৈষ্ণব ও সর্বজনীন ঐতিহ্য (খিচুড়ি ও গোবিন্দভোগ চালের পোলাও):
যেখানে আমিষ ভোগের প্রথা নেই, সেখানে গোবিন্দভোগ চালের সুগন্ধি ঘি-পোলাও, ছানার ডালনা, লাল জহরত আলুভাজা, চাটনি ও পায়েসের বিশেষ আয়োজন করা হয়।নবমী নিশি ও বাঙালির ঘরোয়া ভূরিভোজ"নবমী নিশি যেন আর না পোহায়"—এই আকুল প্রার্থনার মাঝেই বাঙালির রান্নাঘরে চলে চূড়ান্ত ব্যস্ততা। নবমীর রাতে প্রতিটি বাঙালি পরিবারেই জমে ওঠে ভুরিভোজের আসর।গরম গরম লুচি আর আলুর দম দিয়ে সকালের সূচনা হলেও, দুপুরের আহারে স্থান পায় সুগন্ধি বাসন্তী পোলাও ও কষা খাসির মাংস (Mutton Kasha)। মিষ্টির পাতে থাকে রাজভোগ, রসগোল্লা আর নতুন গুড়ের সন্দেশ। পুজো পরিক্রমার ফাঁকে রাস্তার ধারের মোগলাই, বিরিয়ানি কিংবা রোল খাওয়ার যে উন্মাদনা, তার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় এই নবমীর রাতেই।

কলকাতা ও নবমীর ভূরিভোজ: বিখ্যাত কিছু রেস্তোরাঁনবমী নিশি মানেই কেবল ঘরে বসে খাওয়া নয়, কলকাতার বুকে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে রেস্তোরাঁয় খাওয়া বাঙালির এক প্রিয় ঐতিহ্য। এই বিশেষ দিনে শহরের ঐতিহ্যবাহী ও নামজাদা কিছু রেস্তোরাঁয় খাবারের অভিজ্ঞতা পুজোর আনন্দকে দ্বিগুণ করে দেয়
৬ বালিগঞ্জ প্লেস (6 Ballygunge Place): খাঁটি রাজকীয় বাঙালি পদ যেমন—দাব চিংড়ি, কষা মাংস, ভেটকি পাতুড়ি ও ছানার পাতুড়ির জন্য এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
ওহ্! ক্যালকাটা (Oh! Calcutta): ভাপা ইলিশ, মোচার ঘণ্ট, চিঙড়ি মালাইকারি এবং গন্ধরাজ ভেটকির মতো ঐতিহ্যবাহী পদের অসাধারণ স্বাদের জন্য খাদ্যরসিকদের অন্যতম প্রিয় ঠিকানা।
কস্তুরী (Kasturi) ও ভূতের রাজা দিল বর: ঢাকাই ও খাঁটি বাঙাল স্বাদের ঐতিহ্যবাহী কচুপাতা চিংড়ি, সর্ষে বাটা ইলিশ ও ভেটকি ভাপার জন্য এই রেস্তোরাঁগুলো বিখ্যাত।
নিজামস (Nizam's), সিরাজ (Siraj) ও আরসালান (Arsalan): যারা নবমীর রাতে মোগলাই খাবার বা বিরিয়ানি দিয়ে পেটপূজো করতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য পার্ক স্ট্রিট ও পার্ক সার্কাসের নিজামস, সিরাজ কিংবা আরসালানের বিরিয়ানি ও কাটি রোল সেরা পছন্দ।
আহা রে বাংলা ও ভোজন রসিক: উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার বুটিক রেস্তোরাঁগুলোতে নবমীর বিশেষ "পূজা থালি" পাওয়া যায়, যেখানে গোবিন্দভোগ চালের পোলাও থেকে শুরু করে রাজকীয় পাঁঠার মাংসের কষা একসঙ্গে পরিবেশন করা হয়।

বাঙালির উৎসব মানেই খাবারের মাধ্যমে ভালোবাসা ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। নবমীর এই ভূরিভোজ কেবল পেটপূজো নয়, এটি পরিবারের সবাইকে এক সুতোয় বাঁধার এক সামাজিক উদযাপন। আগামী বছরের জন্য দেবীকে বিদায় জানানোর আগে, নবমীর সুস্বাদু আহার ও আড্ডা বাঙালির মনে এক চিরন্তন তৃপ্তি রেখে যায়।
- Related topics -
- অন্যান্য
- পুজো ও উৎসব
- দুর্গাপুজো
- রেস্তোরাঁ
- পেটপুজো









