Dr. Bidhan Chandra Roy | ড. বিধান চন্দ্র রায়: সততা ও আধুনিক বাংলার রূপকার!

Key Highlightsবর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে "দুর্নীতি ও ঘুষ ছাড়া কি রাজনীতি সম্ভব?"—এই প্রশ্নটি অনেকের মনেই প্রবলভাবে জাগে। আজকের দিনে যখন ক্ষমতার দাপট, ব্যক্তিপূজা এবং বিপুল আর্থিক প্রলোভন রাজনীতির প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে, তখন ইতিহাস পিছন ফিরে তাকালে এক কালজয়ী ও রূপকথার মতো ব্যক্তিত্বকে দেখতে পাওয়া যায়। তিনি আর কেউ নন, স্বাধীন পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী এবং আধুনিক বাংলার প্রধান রূপকার ড. বিধান চন্দ্র রায় (Dr. Bidhan Chandra Roy)। তিনি নিজের কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করে গেছেন যে, ক্ষমতার লোভে অন্ধ না হয়ে এবং ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থচিন্তা ছাড়া সম্পূর্ণ সততা, নিষ্ঠা ও আদর্শের সাথেও একটি রাজ্যকে সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ভয়াবহ শরণার্থী সংকট থেকে শুরু করে স্বাধীন ভারতের আধুনিক শিল্পায়নের সূচনা—বাংলার অগ্রগতির প্রতিটি পাতায় তাঁর স্বাক্ষর উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে "দুর্নীতি ও ঘুষ ছাড়া কি রাজনীতি সম্ভব?"—এই প্রশ্নটি অনেকের মনেই প্রবলভাবে জাগে। আজকের দিনে যখন ক্ষমতার দাপট, ব্যক্তিপূজা এবং বিপুল আর্থিক প্রলোভন রাজনীতির প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে, তখন ইতিহাস পিছন ফিরে তাকালে এক কালজয়ী ও রূপকথার মতো ব্যক্তিত্বকে দেখতে পাওয়া যায়। তিনি আর কেউ নন, স্বাধীন পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী এবং আধুনিক বাংলার প্রধান রূপকার ড. বিধান চন্দ্র রায় (Dr. Bidhan Chandra Roy)। তিনি নিজের কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করে গেছেন যে, ক্ষমতার লোভে অন্ধ না হয়ে এবং ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থচিন্তা ছাড়া সম্পূর্ণ সততা, নিষ্ঠা ও আদর্শের সাথেও একটি রাজ্যকে সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ভয়াবহ শরণার্থী সংকট থেকে শুরু করে স্বাধীন ভারতের আধুনিক শিল্পায়নের সূচনা—বাংলার অগ্রগতির প্রতিটি পাতায় তাঁর স্বাক্ষর উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।

সততা ও রাজনীতি: নীতিবোধ ও আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত
আজকের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপোষণ এবং কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ অহরহ আমাদের চোখে পড়ে। কিন্তু ড. বিধান চন্দ্র রায়ের জমানায় এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবনচর্চায় এই ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি রাজপ্রাসাদ সমতুল্য বিলাসপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারতেন, কারণ চিকিৎসক হিসেবে লন্ডন থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে MRCP ও FRCS ডিগ্রি অর্জনের পর ভারতে ফিরে তাঁর ব্যক্তিগত মেডিকেল প্র্যাকটিস থেকেই বিপুল টাকা আয় হতো। বলা হয়ে থাকে, তৎকালীন ভারতে তাঁর মতো সফল ও উচ্চবিত্ত চিকিৎসক খুব কমই ছিলেন।
তবে ১৯৪৮ সালে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তিনি সরকারি বেতনের ওপর নির্ভর না করে নিঃস্বার্থভাবে বাংলার মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তিনি রাজনীতিকে কোনোদিন জীবিকা বা অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি, বরং তা ছিল তাঁর কাছে সমাজসেবার পরম ব্রত। ক্ষমতার মোহ তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি; রাজ্য পুনর্গঠন ও জনগণের দুর্দশা দূর করাই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।
আরও পড়ুন : ক্যামব্রিজ ফেরত যে বিপ্লবী এক ডাকে ১ লাখ টাকা দিয়ে গড়েছিলেন আজকের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়!
১৯৪৭-এর দেশভাগ ও অভূতপূর্ব শরণার্থী সংকট মোকাবিলা
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গের আর্থ-সামাজিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় রূপ ধারণ করেছিল। পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করতে শুরু করে। খাদ্যাভাব, সুপেয় জলের সংকট, বাসস্থানের অভাব এবং সার্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় পুরো রাজ্য যখন ভেঙে পড়ার মুখে, ঠিক সেই ভয়াবহ ও কঠিন সময়ে ১৯৪৮ সালে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পদে আসীন হন ড. বিধান চন্দ্র রায়।
তিনি এই অভূতপূর্ব শরণার্থী সংকটকে কেবল একটি তাৎক্ষণিক সামাজিক বা মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখেননি, বরং অত্যন্ত দূরদর্শী চিন্তাভাবনার মাধ্যমে তাঁদের দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী পুনর্বাসনের পথ উন্মোচন করেন। তৎকালীন সরকারের সীমাবদ্ধ সম্পদের মধ্যেও তিনি নিখুঁত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। কল্যাণী, আসানসোল ও দুর্গাপুরের মতো নতুন নতুন নগরী ও শিল্পাঞ্চলের ভাবনা এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ারই ফসল ছিল। এর ফলে কেবল শরণার্থীদের মাথার ওপর ছাদ জোগানো সম্ভব হয়নি, বরং লক্ষ লক্ষ মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থানের সংস্থান হয়েছিল, যা রাজ্যকে এক বিরাট বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করে।

আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের পরিকাঠামো ও পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলার ইতিহাস
পশ্চিমবঙ্গকে একটি অনুন্নত কৃষিভিত্তিক রাজ্য থেকে আধুনিক শিল্প ও পরিকাঠামোসম্পন্ন অগ্রগামী রাজ্যে পরিণত করতে ড. বিধান চন্দ্র রায় যে ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা ইতিহাসে বিরল। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে সুপরিকল্পিত নগর ও শিল্প ছাড়া রাজ্যের সার্বিক বিকাশ অসম্ভব। এই লক্ষ্য পূরণে তিনি প্রধানত পাঁচটি নতুন শহরের পত্তন ও বিকাশ ঘটান:
- দুর্গাপুর: ভারতের খনিজ ও শিল্প সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দুর্গাপুরকে 'ভারতের রুড় অঞ্চল' (Ruhr of India) হিসেবে গড়ে তোলেন। সেখানে বিরাট ইস্পাত কারখানা, কোক ওভেন প্ল্যান্ট ও ভারী প্রকৌশল শিল্প স্থাপন করা হয়।
- বিধাননগর (সল্টলেক): তিলোত্তমা কলকাতার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়া জনঘনত্ব ও বাসস্থানের চাপ কমাতে শহরের পাশের জলাভূমি ভরাট করে এক পরম আধুনিক পরিকল্পিত উপনগরী গড়ে তোলেন, যা আজ তাঁর নামানুসারে 'বিধাননগর' নামে সুপরিচিত।
- কল্যাণী: আধুনিক বাসস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক পরিকাঠামো ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সমন্বয়ে কল্যাণী শহরটিকে একটি মডেল টাউনশিপ হিসেবে নকশা করেন।
- হাওড়া ও হাবড়া-অশোকনগর: দেশভাগ-উত্তর জনস্রোতকে সামাল দিতে এবং যৌথ অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটাতে হাবড়া, অশোকনগর ও হাওড়ার পরিকাঠামোগত সংস্কার সাধন করেন।
- দিঘা: পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ প্রান্তে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত দিঘাকে ভারতের অন্যতম প্রধান সুন্দর উপকূলীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার মূল প্রবক্তা ছিলেন তিনিই।
এছাড়াও, কলকাতার মতো তিলোত্তমা নগরীর পরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে কলকাতা মেট্রো রেলের (Kolkata Metro) প্রাথমিক চিন্তাভাবনা ও ব্লু-প্রিন্ট তাঁর আমলেই অঙ্কিত হয়েছিল। রাজ্যকে বন্যা মুক্ত রাখা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জলসেচ সরবরাহের জন্য ফারাক্কা ব্যারেজ ও ড্যামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (DVC) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর অসামান্য অবদান ছিল।
চিকিৎসা জগতের কিংবদন্তি এবং নিবেদিত মানবসেবা
রাজনীতিবিদ ও দক্ষ প্রশাসকের পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ড. বিধান চন্দ্র রায় ছিলেন তৎকালীন অবিভক্ত ভারত ও আন্তর্জাতিক চিকিৎসা জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। দেশের মুখ্যমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠান করার পরও তিনি প্রতিদিন সকালে নির্দিষ্ট সময়ে সাধারণ ও দরিদ্র রোগীদের নিখরচায় চিকিৎসা সেবা প্রদান করতেন। পদের অহংকার বা ব্যস্ততা তাঁকে কোনোদিন চিকিৎসকের দায়িত্ব থেকে দূরে সরাতে পারেনি।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম কণ্ডারারী মহাত্মা গান্ধী যখনই অসুস্থ হয়ে পড়তেন, তিনি ড. বিধান রায়ের চিকিৎসার ওপর আস্থা রাখতেন। একবার এক ঐতিহাসিক ঘটনার সময় গান্ধীজি রসিকতা করে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "তুমি কেন আমার চিকিৎসা করতে এসেছ? আমি তো তোমার রাজনৈতিক দলের মতামত সমর্থন করি না।" ড. রায় বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, "আমি এখানে কোনো রাজনৈতিক নেতার চিকিৎসা করতে আসিনি, আমি এসেছি এই দেশের ৪০ কোটি মানুষের অভিভাবক ও জাতির জনকের চিকিৎসা করতে।" চিকিৎসা ক্ষেত্রে তাঁর এই অতুলনীয় অবদান ও অনন্য জীবনবোধকে সম্মান জানাতে প্রতি বছর তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিন অর্থাৎ ১লা জুলাই তারিখটি সমগ্র ভারতে জাতীয় চিকিৎসক দিবস (National Doctors' Day) হিসেবে পরম শ্রদ্ধার সাথে উদযাপিত হয়।

বর্তমান রাজনীতির করুণ দৃশ্যপট বনাম বিধান রায়ের কালজয়ী আদর্শ
আজকের দিনের রাজনৈতিক পরিবেশ এবং ড. বিধান চন্দ্র রায়ের যুগের নীতিবোধের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত লক্ষ্য করা যায়। বর্তমান সময়ে রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রেই স্বার্থসিদ্ধি, রাতারাতি সম্পত্তি বৃদ্ধি এবং আড়ম্বরের পথ ধরে হেঁটে চলেছে। নেতিবাচক চর্চা ও তাৎক্ষণিক ভোটের অংকের রাজনীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে ড. রায় ভবিষ্যতের ৫০ বছর বা ১০০ বছর পরের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিতেন।
তিনি দেখিয়ে গেছেন যে রাষ্ট্রনায়ক হতে গেলে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার পেছনে না ছুটে দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করতে হয়। যেখানে আজকের দিনে জনসেবার চেয়ে ব্যক্তিগত লাভের হিসাব প্রাধান্য পায়, সেখানে ড. বিধান চন্দ্র রায় প্রমাণ করেছিলেন সততা ও স্বচ্ছতা বজায় রেখেও দীর্ঘ কাল ধরে জনগণের হৃদয়ে রাজ্যনেতা হিসেবে রাজত্ব করা যায়।
শেষ জীবন, মহৎ মহাপ্রস্থান ও এক অমর স্মৃতি
১৯৬২ সালের ১লা জুলাই, নিজের ৮১তম জন্মদিনের দিনেই এই মহা মানব ও স্বাধীন বাংলার স্থপতি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিজের জীবদ্দশায় উপার্জিত বিপুল সম্পত্তির প্রায় পুরোটাই তিনি মৃত্যুর পূর্বে জনকল্যাণমূলক কাজে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং মেধাভিত্তিক মেডিকেল রিসার্চের উন্নয়নে দান করে দিয়ে যান। এমনকি তাঁর নিজের বাসভবনটিও একটি নার্সিং হোম ও মেডিকেল গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য ট্রাস্টের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
ক্ষমতার উচ্চ শিখরে পৌঁছেও যে সাধারণ মানুষের সেবক থাকা যায় এবং অর্থ-সম্পদের লোভকে দূরে ঠেলে যে সততার সাথে একটি পুরো রাজ্যকে পরিচালনা করা সম্ভব—তা ড. বিধান চন্দ্র রায় চিরকালের জন্য ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। দুর্নীতির বর্তমান অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ড. বিধান চন্দ্র রায়ের আদর্শ, জীবনগাথা ও রাষ্ট্রগঠনের চিন্তা আজ এবং আগামী ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য এক চিরন্তন ও দিকনির্দেশক আলোকবর্তিকা।
- Related topics -
- ভারতের গর্ব
- রাজ্য
- পশ্চিমবঙ্গ









