Dakshineswar Kali Temple | রানি রাসমণির স্বপ্নে এসেছিলেন মা কালী! কীভাবে তৈরি হয়েছিল বিখ্যাত দক্ষিণেশ্বর মন্দির?

Sunday, November 8 2026, 1:01 pm
Dakshineswar Kali Temple | রানি রাসমণির স্বপ্নে এসেছিলেন মা কালী! কীভাবে তৈরি হয়েছিল বিখ্যাত দক্ষিণেশ্বর মন্দির?
highlightKey Highlights

বাংলার অন্যতম বিখ্যাত তীর্থস্থান দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির (Dakshineswar Kali Temple)। ১৮৫৫ সালে রানি রাসমণির প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরে অধিষ্ঠিত রয়েছেন মা ভবতারিণী, যিনি আদ্যাশক্তি মহাকালীর এক বিশেষ রূপ। মন্দিরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রানি রাসমণির স্বপ্নাদেশ, মা কালীর পৌরাণিক কাহিনি এবং শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের গভীর সাধনা। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, কাশী তীর্থযাত্রার আগে স্বপ্নে মা কালীর নির্দেশ পেয়েছিলেন রানি রাসমণি। সেই নির্দেশেই গঙ্গার তীরে নির্মিত হয় দক্ষিণেশ্বর মন্দির। ভবতারিণী নামের অর্থ যিনি ভক্তদের সংসারের দুঃখ-কষ্ট ও জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তির পথ দেখান। হিন্দু পুরাণে মা কালীর আবির্ভাব, শুম্ভ-নিশুম্ভ বধ এবং রক্তবীজ অসুরের বিনাশের কাহিনি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রক্তবীজের রক্ত পান করে দেবী কীভাবে অসুরের পুনর্জন্ম বন্ধ করেছিলেন, তার সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে দেবী কালীর প্রসারিত জিহ্বার পৌরাণিক ব্যাখ্যা। এছাড়া মহাদেব শিবের বক্ষের উপর দেবীর অবস্থানের পিছনেও রয়েছে বিশেষ পৌরাণিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে রয়েছে পঞ্চবটি, পঞ্চমুণ্ডির আসন, বারোটি শিবমন্দির এবং রাধাকান্ত মন্দির। শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনা দক্ষিণেশ্বরকে বিশ্বব্যাপী আধ্যাত্মিক পরিচিতি এনে দিয়েছে। আজও মা ভবতারিণী লক্ষ লক্ষ ভক্তের বিশ্বাস, ভক্তি ও আশ্রয়ের প্রতীক।


বাংলার অন্যতম বিখ্যাত তীর্থস্থান হল দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির (Dakshineswar Kali Temple)। হুগলি নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত এই মন্দিরে অধিষ্ঠিত রয়েছেন মা ভবতারিণী (Maa Bhavatarini)। গঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণী মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি বাংলার ইতিহাস, পুরাণ, আধ্যাত্মিকতা এবং অসংখ্য বিশ্বাসের মিলনক্ষেত্র। ১৮৫৫ সালে রানি রাসমণির হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির আজও লক্ষ লক্ষ ভক্তের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। এখানে অধিষ্ঠিত দেবী মা ভবতারিণী আদ্যাশক্তি মহাকালীর এক বিশেষ রূপ হিসেবে পূজিত হন।

মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রানি রাসমণির স্বপ্নাদেশ, দেবী কালীর পৌরাণিক আবির্ভাব, অসুরবিনাশের কাহিনি এবং শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের গভীর সাধনার ইতিহাস। কিন্তু কেন দেবীর নাম ভবতারিণী? কেন তাঁর পায়ের নিচে শায়িত মহাদেব? আর কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল মা কালীর এই ভয়ংকর অথচ করুণাময়ী রূপ?

Trending Updates

রানি রাসমণির স্বপ্নাদেশ: মা কালীর নির্দেশেই তৈরি হয়েছিল মন্দির?

দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বাংলার বিশিষ্ট সমাজসেবী ও ধর্মপ্রাণ নারী রানি রাসমণি। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, ১৮৪৭ সালে তিনি কাশী তীর্থযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। যাত্রার আগের রাতে স্বপ্নে মা কালী তাঁকে দর্শন দেন। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী তাঁকে বলেছিলেন, কাশী যাওয়ার প্রয়োজন নেই। গঙ্গার তীরে একটি সুন্দর মন্দির নির্মাণ করে সেখানে তাঁর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করতে। দেবী সেই মূর্তিতেই অধিষ্ঠান করবেন এবং ভক্তদের পুজো গ্রহণ করবেন। স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর রানি রাসমণি তীর্থযাত্রা স্থগিত করেন এবং দক্ষিণেশ্বরে জমি কেনার উদ্যোগ নেন। ১৮৪৭ সালে জমি কেনার পর শুরু হয় মন্দির নির্মাণের কাজ। অবশেষে ১৮৫৫ সালের ৩১ মে মন্দিরের প্রতিষ্ঠা হয়।

মা ভবতারিণী নামের অর্থ কী? কেন এই নামে পূজিত হন দেবী?

'ভব' অর্থ সংসার বা জন্ম-মৃত্যুর চক্র এবং 'তারিণী' অর্থ যিনি পার করে দেন। অর্থাৎ ভবতারিণী হলেন সেই দেবী, যিনি ভক্তকে সংসারের দুঃখ-কষ্ট, মোহ-মায়া ও বন্ধন থেকে মুক্তির পথ দেখান। শাক্ত ধর্মীয় বিশ্বাসে মা কালী হলেন আদ্যাশক্তি। তিনি কখনও মহাকালী, কখনও দক্ষিণাকালী, কখনও শ্যামা আবার কখনও ভবতারিণী রূপে পূজিত হন। দক্ষিণেশ্বরের দেবীকে মন্দিরের সরকারি ওয়েবসাইটে শ্রীশ্রী জগদীশ্বরী কালীমাতা ঠাকুরানি নামেও উল্লেখ করা হয়েছে।

পৌরাণিক কাহিনি: কীভাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন মা কালী?

দেবী কালীর আবির্ভাব নিয়ে হিন্দু পুরাণে একাধিক কাহিনি রয়েছে। তার মধ্যে দেবী মাহাত্ম্য বা চণ্ডীর শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের কাহিনি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

পৌরাণিক আখ্যান অনুসারে, শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামে দুই অসুর দেবলোক দখল করে দেবতাদের স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করেছিল। দেবতারা তখন আদ্যাশক্তি দেবীর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। দেবী চণ্ডিকা অসুরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। চণ্ডীতে বর্ণিত রয়েছে যুদ্ধের এক পর্যায়ে আদ্যাশক্তি মহামায়ার ক্রোধ থেকে কালী আবির্ভূতা হন। তাঁর কৃষ্ণবর্ণ রূপ, উন্মুক্ত কেশ এবং ভয়ংকর দর্শন দেখে অসুরদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই কাহিনিতে মা কালীকে অশুভ শক্তির বিনাশকারিণী এবং দেবতাদের রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

রক্তবীজ বধ: কেন মা কালীর জিহ্বা প্রসারিত?

মা কালীর পৌরাণিক কাহিনির মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হল রক্তবীজ বধের গল্প। রক্তবীজ ছিল এক ভয়ংকর অসুর। তার বিশেষ বর ছিল, তার শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়লেই সেই রক্ত থেকে আরেকটি রক্তবীজের জন্ম হবে। ফলে যতবার দেবতারা তাকে আঘাত করতেন, ততবারই অসুরের সংখ্যা বেড়ে যেত। তখন দেবী কালী যুদ্ধক্ষেত্রে আবির্ভূতা হন। তিনি নিজের জিহ্বা প্রসারিত করে রক্তবীজের শরীর থেকে বেরিয়ে আসা রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই পান করতে থাকেন।

ফলে নতুন অসুরের জন্ম বন্ধ হয় এবং শেষ পর্যন্ত রক্তবীজের বিনাশ ঘটে। এই কাহিনি থেকেই দেবী কালীর প্রসারিত জিহ্বার একটি প্রচলিত পৌরাণিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এটি অশুভ শক্তির সম্পূর্ণ বিনাশের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়।

মা কালীর পায়ের নিচে মহাদেব শিব কেন?

দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণীর মূর্তির অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, দেবী মহাদেব শিবের বক্ষের উপর দণ্ডায়মান। এর পিছনে রয়েছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পৌরাণিক কাহিনি। কথিত আছে, অসুরদের বিনাশ করার পর দেবী কালী প্রচণ্ড ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠেন। তাঁর তাণ্ডবে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।

দেবীকে শান্ত করার জন্য দেবতারা মহাদেবের শরণাপন্ন হন। তখন মহাদেব যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে দেবীর সামনে শুয়ে পড়েন। যুদ্ধের উন্মাদনায় দেবী শিবের বুকে পা রাখেন। নিজের স্বামীর বুকে পা পড়তেই তিনি লজ্জায় জিহ্বা বের করে ফেলেন এবং শান্ত হন।এই কাহিনির গভীর দার্শনিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। শাক্ত দর্শনে দেবী হলেন শক্তি এবং শিব হলেন চেতনার প্রতীক। শক্তি ছাড়া শিব নিষ্ক্রিয়, আবার শিব ছাড়া শক্তির প্রকাশ অসম্পূর্ণ।

দশমহাবিদ্যার প্রথম রূপ মা কালী

শাক্ত তন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হল দশমহাবিদ্যা। দেবীর দশটি বিশেষ রূপকে একত্রে দশমহাবিদ্যা বলা হয়। এই দশটি রূপের মধ্যে প্রথম হলেন মা কালী। অন্য রূপগুলির মধ্যে রয়েছেন তারা, ত্রিপুরাসুন্দরী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলামুখী, মাতঙ্গী ও কমলা। এই দশটি রূপের প্রত্যেকটির রয়েছে আলাদা আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। কোথাও দেবী জ্ঞান ও মুক্তির প্রতীক, কোথাও আবার তিনি ভয় ও অশুভ শক্তির বিনাশকারিণী।

শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনা: পাথরের মূর্তিতে জীবন্ত মা?

দক্ষিণেশ্বরের ইতিহাসে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাধনা এক বিশেষ অধ্যায়। প্রচলিত জীবনকথা অনুসারে, মা ভবতারিণীর পুজো করতে করতে শ্রীরামকৃষ্ণ একসময় গভীর আধ্যাত্মিক আকুলতায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগত, মা কি সত্যিই জীবন্ত? তিনি কি তাঁর ভক্তের ডাক শুনতে পান? মায়ের দর্শন পাওয়ার জন্য তিনি গভীর সাধনা ও ধ্যান করতেন। তাঁর জীবনীতে বর্ণিত রয়েছে, একদিন মায়ের দর্শন না পেয়ে তিনি অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে পড়েন। বহু সাধনার পর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মধ্যে দেবীর জ্যোতির্ময় রূপ অনুভব করেন।

শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে মা কালী ছিলেন জীবন্ত মাতৃসত্তা। তিনি দেবীকে নিজের মায়ের মতো ভালোবাসতেন এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন। এই সাধনাই পরবর্তীকালে দক্ষিণেশ্বরকে বিশ্বব্যাপী আধ্যাত্মিক পরিচিতি এনে দেয়।

পঞ্চবটি ও পঞ্চমুণ্ডির আসন: দক্ষিণেশ্বরের রহস্যময় সাধনাস্থল

দক্ষিণেশ্বর মন্দির চত্বরে রয়েছে পঞ্চবটি। শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনজীবনের সঙ্গে এই স্থান গভীরভাবে জড়িত। পঞ্চবটি নামের অর্থ পাঁচটি পবিত্র বৃক্ষের সমাহার।

বট, অশ্বত্থ, বেল, অশোক ও আমলকী—এই পাঁচটি গাছকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল সাধনার পরিবেশ। মন্দিরের প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, শ্রীরামকৃষ্ণ এখানে ধ্যান ও সাধনা করতেন। মন্দির চত্বরে রয়েছে পঞ্চমুণ্ডির আসন, যা তান্ত্রিক সাধনার সঙ্গে যুক্ত। তন্ত্রসাধনায় এই আসনের বিশেষ ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে। ভৈরবী ব্রাহ্মণীর নির্দেশনায় শ্রীরামকৃষ্ণ এখানে তান্ত্রিক সাধনা করেছিলেন বলে মন্দিরের ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে একই চত্বরে কালী, শিব ও বিষ্ণুর আরাধনা

দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আরও একটি বিশেষত্ব হল, একই চত্বরে শাক্ত, শৈব ও বৈষ্ণব উপাসনার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রধান মন্দিরে মা ভবতারিণীর আরাধনা হয়। গঙ্গার ঘাটের পাশে রয়েছে বারোটি শিবমন্দির।

রাধাকান্ত মন্দিরে রাধা ও কৃষ্ণের বিগ্রহ পূজিত হয়। অর্থাৎ একই মন্দির চত্বরে শক্তি, শিব এবং বিষ্ণুর আরাধনা করা হয়। এটি বাংলার ধর্মীয় সম্প্রীতি ও বিভিন্ন সাধনপথের সমন্বয়ের এক সুন্দর উদাহরণ।

মা ভবতারিণী শুধু দক্ষিণেশ্বরের নন, ভক্তদের বিশ্বাসের আশ্রয়

দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণী মন্দিরের ইতিহাসে যেমন রয়েছে রানি রাসমণির স্বপ্নাদেশ, তেমনই রয়েছে দেবী কালীর পৌরাণিক অসুরবিনাশের কাহিনি। রয়েছে মহাদেব শিবের সঙ্গে দেবীর সম্পর্ক, দশমহাবিদ্যার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য এবং শ্রীরামকৃষ্ণের গভীর সাধনা। ১৮৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের বিশ্বাসের কেন্দ্র। ভক্তদের কাছে মা ভবতারিণী হলেন সেই মাতৃশক্তি, যিনি জীবনের সমস্ত বাধা পার করে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেন। গঙ্গার তীরে দক্ষিণেশ্বরের মন্দির তাই শুধু ইট-পাথরের স্থাপত্য নয়, এটি বাংলার ধর্মীয় ঐতিহ্য, পৌরাণিক বিশ্বাস এবং আধ্যাত্মিক চেতনার এক জীবন্ত ইতিহাস।




পিডিএফ ডাউনলোড | Print or Download PDF File