বিশ্ব উষ্ণায়ন

Global Warming Effects | ৭ দিনে মৃত শতাধিক ডলফিন! অ্যান্টার্কটিকায় বরফ গলে মৃত্যু হাজারো পেঙ্গুইনের! অ্যান্টার্কটিকায় ফুটছে ফুল! বিশ্ব উষ্ণায়ণ নিয়ে সতর্কবার্তা বিজ্ঞানীদের!

Global Warming Effects | ৭ দিনে মৃত শতাধিক ডলফিন! অ্যান্টার্কটিকায় বরফ গলে মৃত্যু হাজারো পেঙ্গুইনের! অ্যান্টার্কটিকায় ফুটছে ফুল! বিশ্ব উষ্ণায়ণ নিয়ে সতর্কবার্তা বিজ্ঞানীদের!
Key Highlights

গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের জেরে বাড়ছে তাপমাত্রা। সাত দিনে মৃত্যু হয়েছে ১২০টিরও বেশি আমাজন নদীর ডলফিনের। বরফ গলে জলে ডুবে মৃত্যু প্রায় ১০ হাজার পেঙ্গুইন শাবকের। বরফের চাদর সরিয়ে অ্যান্টার্কটিকায় ফুটছে অস্বাভাবিক ফুল।

ছোটবেলায় প্রাথমিক শিক্ষায় নিজেদের ভাষা, বিজ্ঞান, অঙ্কের মতো সকলেই শিখে আসছি পরিবেশ সম্পর্কে। কম বেশি সকলেই আমরা বাল্যকাল থেকেই পরিচিত 'গ্লোবাল ওয়ার্মিং' (Global Warming) বা বিশ্ব উষ্ণায়ন শব্দটির সঙ্গে। অনেকেই ছোটবেলায় বিদ্যালয়ে পরিবেশ, পরিবেশ রক্ষা এবং বিশেষ করে গ্লোবাল ওয়ার্মিং সম্পর্কে এবং গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর প্রভাব প্রবন্ধ (Effects of Global Warming Essay)-ও লিখেছি। 'যদি অ্যান্টার্কটিকায় বরফ গলে যায় তাহলে...'! তবে এখন এই বাক্যে 'যদি' নেই! গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর প্রভাব প্রবন্ধ (Effects of Global Warming Essay) এর মতো গোটা বিশ্ব জুড়েই ভয়ানক প্রভাব পড়ছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর। ব্রাজিলে ক্রমশ বাড়তে থাকা তাপমাত্রার কারণে এক সপ্তাহের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১২০টিরও বেশি আমাজন নদীর ডলফিন (Amazon River Dolphin) এর! অ্যান্টার্কটিকায় মৃত্যু হয়েছে হাজার হাজার পেঙ্গুইন শাবকের! বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব এতটাই গুরুতর হয়ে উঠেছে যে চিরকাল বরফে ঢাকা অ্যান্টার্কটিকার বরফের চাদর সরে ফুটছে ফুল!

গ্লোবাল ওয়ার্মিং-র প্রভাবে শতাধিক আমাজন নদীর ডলফিনের মৃত্যু । Hundreds of Amazon River Dolphin Have Died Due to Global Warming :

পৃথিবীর দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী আমাজন (Amazon River)। দক্ষিণ আমেরিকায় অবস্থিত আমাজনের একটা বড় অংশ ব্রাজিলের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। এক সময়ে জীবজন্তুর নিরাপদ স্থান ছিল এই আমাজন। বিশেষ করে আমাজন নদীতে বেড়াতো অসংখ্য জলজ প্রাণী। তবে বর্তমানে বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে তাপমাত্রা। আর এই কারণেই গত এক সপ্তাহের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১২০টিরও বেশি আমাজন নদীর ডলফিন (Amazon River Dolphin) এর। গত সাত দিনে এতগুলো ডলফিনের মৃত্যুতে বিস্মিত বিজ্ঞানীরাও। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, তাপ ও ​​খরার কারণে আমাজন নদীর জলস্তর কমে গিয়েছে এবং এ কারণে অক্সিজেনের পরিমাণও কমছে ক্রমাগত। যার ফলে ডলফিনের মৃত্যু হচ্ছে এবং নদীর তীরে ভেসে আসছে দেহ!

বর্তমানে আমাজন নদীতে জলের উষ্ণতা ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট। আর সেন্টিগ্রেডে তা হিসেব করা হলে দাঁড়ায় ৩৯ডিগ্রিতে। বিজ্ঞানীদের মতে, ডলফিনগুলি মারা যাওয়ার সময় তাপমাত্রা ছিল ৩৯ডিগ্রির কাছাকাছি, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ডিগ্রি বেশি। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হল, যে ডলফিনগুলি মারা গিয়েছে তাদের রঙ গোলাপী , যা ব্রাজিলে তারা বোটোস নামে পরিচিত। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রচন্ড তাপের জেরে ও ​​অক্সিজেনের অভাবে ডলফিনরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমাজনে ডলফিনের সংখ্যা স্বাভাবিক নদীর তুলনায় বেশি। কিন্তু জলের অভাব এবং জলের প্রবাহ হ্রাসের কারণে প্রধানত দু’টি প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এক, অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়া। আর দুই জলের প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে প্রজনন হার কমে যাওয়া। বিজ্ঞানীদের মতে, মৃত ডলফিনের ময়নাতদন্ত করা হলে, তা থেকে এই রিপোর্ট উঠে এসেছে। কেবল ডলফিনই নয়, এর আগে হাজার হাজার মাছও মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে হঠাৎ আমাজন নদীর ডলফিন (Amazon River Dolphin) সহ হাজারো জলজপ্রাণীর মৃত্যু ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে প্রচন্ড তাপমাত্রা। আর এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির নেপথ্যে কারণ সেই গ্লোবাল ওয়ার্মিং!

বরফের চাদর সরিয়ে অ্যান্টার্কটিকায় ফুটছে ফুল । Flowers are blooming in Antarctica :

ইতিমধ্যেই অ্যান্টার্কটিকায় ফুল ফোটা এবং গাছ গজিয়ে ওঠার খবরে সাড়া পড়ে গিয়েছে সর্বত্র। অ্যান্টার্কটিকায় জমির দাম কত হতে পারে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে চর্চা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এই ঘটনা মোটেই শুভ নয়! বরং আসন্ন বিপদ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার সময় এসেছে বলে মত বিজ্ঞানীদের। লাগাতার বাড়তে থাকা পরিবেশ দূষণ এবং গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে এমনিতে অ্যান্টার্কটিকার বরফের চাদর ক্রমশ পাতলা হয়ে উঠছে। আগে গোটা সাগরের উপর বরফের পুরু চাদর থাকলেও, ১০রা সেপ্টেম্বর প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তার বিস্তৃতি কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার (NASA), ন্যাশনাল স্টোন অ্যান্ড আইস ডেটা সেন্টারের (National Stone and Ice Data Center) হিসেব অনুযায়ী, বর্তমানে অ্যান্টার্কটিকার মাত্র ১ কোটি ৬৯ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়েই বরফ রয়েছে। ২০২৩ সালের গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রার পারদ যেভাবে লাগাতার চড়েছে, তারই ফলশ্রুতি হিসেবে অ্যান্টার্কটিকায় বরফের এই বিস্তৃতি কমে গিয়েছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। এবছর মার্চ মাসে পর পর তিন দিন দক্ষিণ মেরুর কাছে তাপমাত্রা ছিল ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এমন অস্বাভাবিকতা আগে কখনওই চোখে পড়েনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের হাত থেকে অ্যান্টার্কটিকারও রক্ষা নেই বলে মত বিজ্ঞানীদের। এর আগে, ২০২২ সালে ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন অ্যান্টার্কটিকায় এযাবৎকালীন সবচেয়ে তীব্র তাপপ্রবাহের কথা জানিয়েছিল। রিগলওয়র্থ জানিয়েছেন, গত শতকেই বৈশ্বিক তাপপ্রবাহের মাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গিয়েছে। ২০৯৬ সাল আসতে আসতে তা আরও ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। ২০২৩ এর মার্চ মাসে অ্যান্টার্কটিকার তাপমাত্রা এতটা বৃদ্ধি পেতে পারে যে, তাতে গলে যেতে পারে বরফ। আর এই কথাই সত্যি হলো! অ্যান্টার্কটিকায় ফুটছে ফুল! যা একদমই স্বাভাবিক নয় বলেই জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা!

অ্যান্টার্কটিকায় মূলত হেয়ার গ্রাস (Hair Grass) এবং অ্যান্টার্কটিক পার্লওয়ার্ট (Antarctic Pearlwort), এই দুই প্রজাতির গাছের ফুল চোখে পড়ে। এর মধ্যে ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত হেয়ার গ্রাস-এর বৃদ্ধি গত ৫০ বছরের রেকর্ড ছাপিয়ে গিয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে অ্যান্টার্কটিক পার্লওয়ার্ট (Antarctic Pearlwort)-এর বৃদ্ধিও পাঁচ গুণ বেশি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে শুধু এই দুই গাছের ফুলই নয়, জন্মাতে দেখা যাচ্ছে অন্যান্য ফুলও, যা কি না দক্ষিণের সিগ্নি (Signy) দ্বীপেই মূলত চোখে পড়ে। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতেই সময়ের সঙ্গে অ্যান্টার্কটিকায় গাছের সংখ্যা বাড়ছে। অলাভজনক পরিবেশ সংস্থা ডিসকভারিং আন্টার্কটিকা জানিয়েছে, মনুষ্যঘটিত কারণেই অ্যান্টার্কটিকার গড় তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গিয়েছে। এর ফলে বরফও গলতে শুরু করে দিয়েছে সেখানে।

অ্যান্টার্কটিকায় মৃত্যু হাজার হাজার পেঙ্গুইনের । Thousands of Penguins Died in Antarctica :

গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর প্রভাবে মৃত্যু হয়েছে অ্যান্টার্কটিকায় হাজার হাজার পেঙ্গুইনেরও! জলবায়ু পরিবর্তন লহমায় মেরে ফেলল ১০ হাজার পেঙ্গুইনবাচ্চাকে। জানা গিয়েছে, এই পেঙ্গুইনদের পালক সাঁতারের উপযোগী হয়ে ওঠার আগেই তাদের পায়ের নীচে থাকা সমুদ্রবরফ গলে যায় এবং তা ভেঙে পড়ে। বরফজলে ডুবে বা ঠান্ডায় জমে পেঙ্গুইন বাচ্চাগুলির মৃত্যু ঘটেছে।

বেলিংসহাউজেন সাগরে (Bellingshausen Sea) পাঁচটি পেঙ্গুইন কলোনি নিয়ে পর্যবেক্ষণ চালান গবেষকেরা। বিজ্ঞানীদের ওই গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে, পেঙ্গুইন পাখিরা এই অঞ্চলের জমা বরফে সাধারণত হাজির হয় মার্চ মাসের দিকে। এখানে তারা সঙ্গী খুঁজে নেয়। পরে ডিম পাড়ে এবং সেই ডিম ফুটিয়ে বাচ্চার জন্ম দেয়। কয়েকমাস ধরে তাদের বড়ও করে এই একই অঞ্চলে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি হয় এই ঠান্ডা বরফমোড়া পরিবেশে। ডিসেম্বর-জানুয়ারি নাগাদ বাচ্চা পেঙ্গুইনগুলি সমুদ্রে নামে। কিন্তু নির্দিষ্ট এই ঘটনায় গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, এমপেরর পেঙ্গুইনের হাজার হাজার বাচ্চার পালক সাঁতারের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আগেই তারা যে-বরফচাদরের ওপর বসবাস করছিলো তাতে ফাটল ধরে নভেম্বর মাসে। এই অবস্থায় তাদের পায়ের নীচের বরফস্তর ভেঙে যায় এবং হাজার হাজার পেঙ্গুইন শাবক গিয়ে পরে ঠান্ডা বরফজমা জলে এবং সাঁতার না কাটতে পারায় সেখানেই ডুবে মৃত্যু হয় তাদের।

উল্লেখ্য, উচ্চতা এবং ওজনের দিক থেকে পেঙ্গুইনের সবচেয়ে বড় প্রজাতি হল 'এমপেরর পেঙ্গুইন (Emperor Penguin)। এই 'এমপেরর পেঙ্গুইনে'র ১০ হাজার শাবকের মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটেছে ২০২২ সালের শেষ দিকে। তবে তখনই প্রকাশ্যে আসেনি এই ঘটনা। পরে উপগ্রহচিত্রে ধরা পরার পর জানাজানি হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, যে হরে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বেড়ে চলেছে এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে এই শতকের শেষ নাগাদ পৃথিবী থেকে এমপেরর পেঙ্গুইনের ৯০ শতাংশেরও বেশি আবাসস্থল হারিয়ে যাবে।