Ramnami Tribe | মন্দিরে প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ, প্রতিবাদে গোটা শরীরে 'রাম-নাম' উল্কি করে শরীরকেই 'মন্দির' বানায় রামনামী উপজাতি!

Friday, January 5 2024, 1:27 pm
highlightKey Highlights

রামনামী উপজাতির মানুষদের গোটা পুরো শরীরে উল্কি করা শ্রী রামের নাম। অযোধ্যায় রাম মন্দির উদ্বোধনের আগে জানুন রামনামী উপজাতি সম্পর্কে।


২২সে জানুয়ারি ২০২৪-এ অযোধ্যায় রাম মন্দির (Ayodhya Ram Mandir) আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণের জন্য খুলতে চলেছে। রাম মন্দির প্রাণ প্রতিষ্টা অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সারা দেশে উত্তেজনার পরিবেশ তৈরী হয়েছে। মন্দির নিয়ে রামভক্তদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। অযোধ্যায় ৫৫০ বছর অপেক্ষার পর রামলালা তাঁর জন্মস্থানে বসতে চলেছেন। এদিকে, ভগবান শ্রীরামের নিবেদিত ভক্তদের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক গল্পও সামনে আসছে। এরকমই নানান কাহিনীর মধ্যে উঠে এসেছে এক বিশেষ সম্প্রদায়ের কথা। রামনামী উপজাতি (Ramnami Tribe)। এই সম্প্রদায়ের মানুষের মনে তো বটেই এমনকি গোটা শরীরেও বাস করেন ভগবান রাম। তাদের পুরো শরীরে উলকি (Full Body Tattoo) করে লেখা শ্রীরাম! আসুন জেনে নেওয়া যাক রাম ভক্ত এই উপজাতি সম্পর্কে।

রামনামী উপজাতির মানুষদের গোটা পুরো শরীরে উল্কি করা শ্রী রামের নাম
রামনামী উপজাতির মানুষদের গোটা পুরো শরীরে উল্কি করা শ্রী রামের নাম

রামনামী উপজাতি (Ramnami Tribe) নিয়ে নানা কাহিনী প্রচলিত আছে। কথিত আছে যে এক সময় উচ্চবর্ণের লোকেরা এই সমাজকে বয়কট করেছিল এবং মন্দিরগুলিতে প্রবেশ বন্ধ করেছিল। এরপর সারা শরীরে ভগবান রামের নাম লিখে প্রতিবাদ শুরু করেন এই উপজাতির মানুষরা। ছত্তিশগড় রাজ্যের জাঞ্জগির-চাম্পার ছোট্ট গ্রাম চরপাড়ায় এই সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। কথিত আছে যে এই সমিতিটি ১৮৯০ সালের দিকে একজন সাতনামী যুবক পরশুরাম বা ভগবান পরশুরাম (Bhagwan Parshuram) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে কিছু উচ্চবর্ণের লোক তাদের হয়রানি শুরু করে। এ নিয়ে ১৯১২ সালে পরশুরাম ও তার অনুসারীরা ব্রিটিশ আদালতে আপিল করেন। এরপর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পরশুরামের অনুসারীদের পক্ষে রায় দিয়ে বলেন যে, ‘রাম’ নামটি কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সম্পত্তি হতে পারে না। রামের নামে সবার অধিকার আছে। তবে এরপর শরীরে রামের নামের ট্যাটু বা উলকি আঁকার সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায় এবং ক্রমশ রামের নাম ট্যাটু করা এই সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে একটি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি পরিণত হয়। এছাড়াও বলা হয়, মুঘলরা যখন এই উপজাতির মানুষকে ভগবান রামের থেকে আলাদা করার চেষ্টা করেছিল, তখন তারা ভগবান শ্রীরামের নাম তাদের সারা শরীরে লিখে দিয়েছিল।

 অধ্যাপক রামদাস তাঁর এক বইতে এই রামনামী সম্প্রদায় সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে জানান, পুর্বে এঁরা ছিল চর্মকার বা মুচি। চামড়ার জিনিস তৈরি করাই ছিল এঁদের প্রধান পেশা। তাই উচ্চবর্ণের হিন্দুরা এঁদের কার্যত অচ্ছুৎ বলেই মনে করতেন। কোনও সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল না এঁদের। এমনকি মন্দিরে ঢোকার অধিকারও দেওয়া হত না। অধ্যাপকের মতে, হিন্দু সমাজের উচ্চবর্ণের এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে একসময় বেশ কিছু চর্মকার পেশা বদল করেন। কেউ শুরু করেন চাষবাস, আবার কেউ বেছে নেন মৃৎশিল্প। অনেকে আবার ধাতুশিল্পকেও পেশা হিসেবে বেছে নেন। অন্যদিকে, ধর্মের দিক দিয়ে এঁরা আকড়ে ধরেন মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্রকে। রামায়ণ বলে, বনবাসকালে সমাজের প্রান্তিক মানুষদের বুকে টেনে নিয়েছিলেন শ্রীরাম। সেই রামচন্দ্রকেই নিজেদের সহায় সম্বল হিসেবে আঁকড়ে ধরেন এই অত্যাচারিত মানুষগুলো। নিজেদের নামের সঙ্গে তাঁরা জুড়ে দেন রামের নাম। তাদের  রামের মূর্তি ছোঁয়ার অধিকার ছিল না। তাই সারা শরীরে রামের নাম উল্কি করে ফেলেন তাঁরা।

উচ্চবর্ণের হিন্দুরা রামনামী উপজাতির  মানুষদের কার্যত অচ্ছুৎ বলেই মনে করতেন
উচ্চবর্ণের হিন্দুরা রামনামী উপজাতির মানুষদের কার্যত অচ্ছুৎ বলেই মনে করতেন

রামনামী উপজাতির মানুষের ভগবান শ্রীরামের প্রতি অবিচল বিশ্বাস রয়েছে। মনে করা হয়, ভারতে রামনামী উপজাতির প্রায় ১ লক্ষ মানুষ বাস করেন। তবে ভারতে রামনানী উপগোষ্ঠীর মানুষ কোথায় বাস করেন, সে বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু এটি ছত্তিশগড়ের মহানদীর তীরে অবস্থিত। এ ছাড়া রামনামী উপজাতির কিছু লোক ওড়িশা ও মহারাষ্ট্রেও রয়েছে। রামনানী উপজাতির মানুষরা শুধু হাত বা মুখে নয়, তাদের প্রায় পুরো শরীরে ট্যাটু (Full Body Tattoo) করা থাকে শ্রীরামের নাম। তাঁদের ঐতিহ্য রক্ষার জন্য, এই সমাজে একটি নিয়ম রয়েছে যে শিশুদের ২ বছর বয়সের মধ্যে তাদের বুকে রামের নামের ট্যাটু করা বাধ্যতামূলক। রামনামী সমাজ তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আইনি নিবন্ধনও পেয়েছে।

এই সমাজে একটি নিয়ম রয়েছে যে শিশুদের ২ বছর বয়সের মধ্যে তাদের বুকে রামের নামের ট্যাটু করা বাধ্যতামূলক
এই সমাজে একটি নিয়ম রয়েছে যে শিশুদের ২ বছর বয়সের মধ্যে তাদের বুকে রামের নামের ট্যাটু করা বাধ্যতামূলক

উল্লেখ্য, এঁদের সমাজে সকলেই সমান। সকলের পদবীই রাম। তবে সারা গায়ে রাম নামের উল্কি করার প্রবণতা বর্তমানে কমেছে। বেশ কিছু বয়স্ক মানুষ এখনও জীবিত আছেন যাঁদের সারা শরীরে রাম নামের উল্কি রয়েছে। তবে এখন অনেক রামনামীই এমনটা করেন না। বদলে রামের নাম লেখা একটা নাবাবলি গায়ে জড়িয়ে রাখেন এঁরা। মাথায় পরেন ময়ূরের পালক দিয়ে তৈরি একটি মুকুট। রাম নাম জপ করাই এঁদের প্রধান কাজ। বিভিন্ন মেলা পার্বণে রামকথা শোনানোর ডাক পান এঁরা। বিশেষত ছত্তিসগড়ের রায়পুর জেলায় প্রতিবছর এক বিশাল মেলা বসে শুধুমাত্র রামনামী দের জন্যই। ঘুঙুর পরে রামের নাম করতে করতে অদ্ভুত এক নাচের প্রচলন রয়েছে এই মেলায়। প্রতিবছর লক্ষাধিক মানুষ জড়ো হন এই মেলায়। যাঁদের অধিকাংশই রামনামী সম্প্রদায়ভুক্ত।

এঁদের সমাজে সকলেই সমান। সকলের পদবীই রাম
এঁদের সমাজে সকলেই সমান। সকলের পদবীই রাম

এছাড়া বিভিন্ন গ্রামে এঁদের নিজস্ব প্রার্থনা গৃহও রয়েছে। সেখানেও নিয়মিত রামের নামগান করেন সকলে। তবে মন্দিরে আলাদ করে কোনও বিগ্রহ নেই। তুলসীদাস রচিত রামচরিত মানস সামনে রেখেই মনে প্রাণে রামকে অনুভব করেন এঁরা। উল্লেখ্য, যেহেতু নিজেদের শরীরটাকেই রামের মন্দির বলে মানেন এই সম্প্রদায়ের মানুষ, তাই এরা নিজেদের পবিত্রতা ধরে রাখতে ধূমপান বা মদ্যপান করেন না। এমনকি তাদের নামের মধ্যেও থাকতে হয় রামের উল্লেখ। বর্তমানে রামনামী উপজাতির কথা সেভাবে প্রকাশ্যে না এলেও ২০২৪ সালে  অযোধ্যায় রাম মন্দির (Ayodhya Ram Mandir) উদ্বোধনের আগে উঠে এসেছে এই উপজাতির নাম।




পিডিএফ ডাউনলোড | Print or Download PDF File