Durga Puja 2026 | কৈলাসে ফেরেন উমা, চোখ ছলছল করে ওঠে আপামর বাঙালির: বিসর্জনের আড়ালে বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের গল্প

Wednesday, October 21 2026, 4:39 am
Durga Puja 2026 | কৈলাসে ফেরেন উমা, চোখ ছলছল করে ওঠে আপামর বাঙালির: বিসর্জনের আড়ালে বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের গল্প
highlightKey Highlights

মায়ের মুখে শেষবারের মতো হাত বুলিয়ে দেওয়া, বুকের মধ্যে জমে থাকা কথাগুলো বলতে না পারা, আর চোখের জলে ভেসে ওঠা আগামী বছরের অপেক্ষা—বিজয়া দশমী কি তবে শুধু দেবীর বিসর্জন, নাকি এক মেয়ের বাপের বাড়ি ছেড়ে ফিরে যাওয়ার গল্প? পুরাণের উমা, হিমালয় ও মেনকার আদরের কন্যা, বিয়ের পর থাকেন কৈলাসে মহাদেবের সঙ্গে। শরতের আগমনে তিনি ফিরে আসেন মায়ের কাছে। ঢাকের শব্দ, শঙ্খধ্বনি আর আগমনী গানে ভরে ওঠে বাংলার আকাশ-বাতাস। মেনকার কাছে এ যেন বহুদিন পর মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। কিন্তু চার দিনের সেই সুখের পর আসে বিদায়ের পালা। দশমীর সকালে উমাকে আবার ফিরে যেতে হয় কৈলাসে। মায়ের বুক ভরে ওঠে বিষাদে, আর বিসর্জনের জলে মিশে যায় মানুষের চোখের জল। প্রতিমা ধীরে ধীরে আড়াল হয়ে যায়, তবু থেকে যায় আগামী বছরের অপেক্ষা। দেবী চলে যান, কিন্তু তাঁর জন্য অপেক্ষা কখনও শেষ হয় না। উমার এই ফিরে যাওয়ার গল্প আমাদের শেখায়, বিচ্ছেদ মানেই সম্পর্কের শেষ নয়। ভালোবাসা, স্মৃতি আর পুনর্মিলনের আশা নিয়েই বাঙালি অপেক্ষা করে—আবার উমা আসবেন, আবার মায়ের ঘর আলোয় ভরে উঠবে, অন্য কোনো শরতে।


মায়ের মুখে শেষবারের মতো হাত বুলিয়ে দেওয়া, বুকের মধ্যে জমে থাকা কথাগুলো বলতে না পারা, আর চোখের জলে ভেসে ওঠা আগামী বছরের অপেক্ষা—বিজয়া দশমী কি তবে শুধু দেবীর বিসর্জন, নাকি এক মেয়ের বাপের বাড়ি ছেড়ে ফিরে যাওয়ার গল্প?

শরতের আকাশে তখন তুলোর মতো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। নদীর ধারে কাশফুল দুলছে মৃদু বাতাসে। বাংলার ঘরে ঘরে উৎসবের প্রস্তুতি, ঢাকের শব্দে মুখরিত পথঘাট। আর হিমালয়ের প্রাসাদে যেন অন্য এক অপেক্ষা—মেয়ে উমা আসবে। কত দিন পরে মেয়েকে দেখবেন মেনকা! বিয়ের পর মেয়ে থাকে কৈলাসে, মহাদেবের ঘরে। সেখানে তার সংসার, তার নতুন জীবন। কিন্তু মায়ের কাছে মেয়ে কি কখনও বড় হয়? দূর পাহাড়ের ওপারে সে যতই দেবী হয়ে উঠুক, মেনকার চোখে উমা সেই ছোট্ট মেয়েটিই—যে একদিন মায়ের আঁচল ধরে ঘুরত, অভিমান করলে মুখ ফিরিয়ে বসে থাকত, আর একটু আদর পেলেই সমস্ত দুঃখ ভুলে যেত।

বাংলার আগমনী গানে তাই মেনকার অপেক্ষা শুধু দেবীর আগমনের প্রতীক্ষা নয়; এ যেন বহুদিন পর মেয়ের বাড়ি ফেরার আশায় বুক বেঁধে থাকা এক মায়ের গল্প।

১. যে মেয়ে একদিন ঘর ছেড়েছিল

পুরাণের আখ্যান অনুসারে, হিমালয় কন্যা পার্বতী কঠোর তপস্যার মধ্য দিয়ে শিবকে স্বামীরূপে লাভ করেছিলেন। সেই পার্বতীই উমা, সেই উমারই এক মহাশক্তিময় রূপ দুর্গা। কিন্তু বাংলার লোককল্পনায় এই দেবীতত্ত্বের সঙ্গে মিশে গেছে এক সাধারণ পরিবারের অসাধারণ আবেগ।

বিয়ের পর উমা চলে গিয়েছেন কৈলাসে। তাঁর স্বামী মহাদেব—যোগী, বৈরাগী, সংসারের প্রচলিত নিয়মের বাইরে থাকা এক দেবতা। কৈলাসের জীবন আর পিতৃগৃহের পরিচিত পরিবেশ এক নয়। সেখানে বরফঢাকা পাহাড়, ধ্যানমগ্ন শিব, দেবলোকের অনন্ত বিস্তার। আর এখানে মায়ের স্নেহ, বাবার আদর, শৈশবের স্মৃতি। মেনকার মনে হয়, মেয়ে কি ভালো আছে? শিবের সংসারে তার কি মন টেকে? সে কি মায়ের কথা মনে করে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কোনও পুরাণের পাতায় স্পষ্ট করে লেখা নেই। কিন্তু বাঙালির আগমনী গানে সেই না-বলা প্রশ্নগুলিই যেন ভাষা পেয়েছে। মেয়েকে কাছে পাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি সেখানে রয়েছে মায়ের উদ্বেগ, অভিমান আর বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত শূন্যতা। দেবী দুর্গা তখন আর কেবল দশভুজা নন। তিনি সেই মেয়ে, যে বিয়ের পর অন্য ঘরে চলে যায়; মেনকা সেই মা, যে উৎসবের দিন গুনে গুনে মেয়ের ফেরার অপেক্ষা করে।

২. চার দিনের জন্য ফিরে আসা

“গিরি, এবার আমার উমা এলে…”

অবশেষে আসে শরৎ। উমা ফিরে আসেন মর্ত্যে—বাঙালির ঘরে, মায়ের কাছে। ঘরে যেন আলো জ্বলে ওঠে। ঢাক বাজে, শঙ্খধ্বনি ওঠে, উলুধ্বনিতে ভরে যায় চারদিক। দেবীকে বরণ করা হয়, সাজানো হয় মণ্ডপ, ফুলে ফুলে ভরে ওঠে তাঁর আসন। কিন্তু এই বাহ্যিক আয়োজনের আড়ালে বাঙালির কল্পনায় যেন চলছে এক পারিবারিক পুনর্মিলন। মেনকা মেয়েকে কাছে পেয়েছেন। কত কথা বলার আছে! কৈলাসের খবর, সংসারের কথা, পুরনো দিনের স্মৃতি—কত কিছুই না জানতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সুখের সময় যে এত দ্রুত ফুরিয়ে যায়! প্রথম দিন, দ্বিতীয় দিন, তৃতীয় দিন—আনন্দের মধ্যে দিয়েই এগিয়ে আসে বিদায়ের সময়। উমা জানেন, তাঁকে ফিরে যেতে হবে। কৈলাসে অপেক্ষা করছেন শিব। দেবীরও রয়েছে তাঁর নিজস্ব সংসার, তাঁর কর্তব্য। বাপের বাড়িতে তাঁর এই আসা চিরস্থায়ী নয়। এইখানেই গল্পটি আমাদের চেনা জীবনের মতো হয়ে ওঠে। মানুষ জানে, প্রিয় মুহূর্ত ফুরিয়ে যাবে। তবু সে আনন্দ করে, আপনজনকে কাছে টানে, যতটা সম্ভব সময়কে ধরে রাখতে চায়। ক্ষণস্থায়ী বলেই হয়তো ভালোবাসার মুহূর্তগুলি এত মূল্যবান।

৩. বিজয়ার সকালে মায়ের চোখে জল

দশমীর সকাল। গত কয়েক দিনের উৎসবের রং যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। ঢাকের আওয়াজে আর আগমনের উচ্ছ্বাস নেই; তার তালে মিশে যাচ্ছে বিদায়ের সুর। মণ্ডপে দাঁড়িয়ে থাকা দেবীকে দেখে মনে হয়, তিনি যেন নীরবে তাকিয়ে আছেন তাঁর প্রিয়জনদের দিকে। লোকবিশ্বাসের গল্পে আজ উমাকে ফিরে যেতে হবে কৈলাসে। মেনকার মন কি সহজে মানে? যে মেয়েকে এত দিন পর কাছে পাওয়া গেল, তাকে আবার বিদায় দিতে হবে! মা জানেন, এটাই নিয়ম। মেয়ের নিজের সংসার আছে, নিজের গন্তব্য আছে। তবু মায়ের হৃদয় কি নিয়ম বোঝে? হয়তো তিনি আরও কিছুক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে চান। হয়তো মনে মনে বলেন, আর একটু থাক না মা! আরও দুটো দিন। আরও একবার কাছে এসে বস। আরও একবার তোর মুখের দিকে তাকাই।

এই আকুলতার মধ্যেই বাঙালির বিজয়া দশমীর সবচেয়ে গভীর অনুভূতি লুকিয়ে আছে। বিসর্জনের সময় মানুষ দেবীকে বিদায় জানায় বুক মুচড়ে উঠলে ওঠে দুঃখ। যে মেয়েকে বিদায় দিতে গিয়ে মা চোখ মুছেছেন, যে ছেলেকে দূরে পড়তে পাঠিয়ে বাবা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছেন, যে প্রিয়জন দূর শহরে চলে যাওয়ার সময় শেষবার হাত নেড়েছেন—সব বিদায়ের স্মৃতি এসে মিশে যায় এই মুহূর্তে। এই জল শুধু ধর্মীয় আবেগের নয়; তা ব্যক্তিগত স্মৃতি, পারিবারিক টান আর হারিয়ে যাওয়া সময়েরও জল।

৪. নদীর জলে ভাসে প্রতিমা, থেকে যায় অপেক্ষা

নদীর ঘাটে মানুষের ভিড়। কাঁধে প্রতিমা নিয়ে এগিয়ে চলেছেন অনেকে। ঢাক বাজছে, শঙ্খধ্বনি উঠছে, কারও মুখে স্লোগান—‘আসছে বছর আবার হবে।’ প্রতিমা ধীরে ধীরে জলে নামানো হলো। যে মুখের দিকে মানুষ এত দিন তাকিয়ে ছিল, যে চোখে তারা শক্তি ও আশ্রয় খুঁজেছে, সেই মুখ জলের ঢেউয়ে ধীরে ধীরে আড়াল হয়ে গেলো।

৫. কৈলাসে ফিরে উমা, বাঙালির ঘরে বিজয়া

উমা আবার কৈলাসের পথে। পিছনে পড়ে রইল মায়ের স্নেহ, বাবার বাড়ি, কয়েক দিনের হাসি আর অগণিত স্মৃতি। সামনে অপেক্ষা করছে শিবের সংসার, পাহাড়ের নীরবতা, কর্তব্যের পাহাড়।

এই ফিরে যাওয়ার মধ্যে কোনও পরাজয় নেই। নেই সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার ঘোষণা। আছে জীবনের দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য—যে ঘর ছেড়ে মানুষ বেরিয়ে যায়, সেই ঘরের সঙ্গে তার সম্পর্ক কখনও পুরোপুরি শেষ হয় না। বাঙালির ঘরেও বিজয়ার প্রতিমা বিসর্জনের পর আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া, প্রণাম করা, কোলাকুলি, মিষ্টিমুখ—এসবের মধ্য দিয়ে বিদায়ের বিষাদ একটু একটু করে বদলে যায় মিলনের উষ্ণতায়। যেন দেবী চলে যাওয়ার আগে মানুষকে বলে যান—সম্পর্কগুলিকে আগলে রেখো। দূরে থাকলেও আপনজনকে ভুলে যেয়ো না। অভিমান জমিয়ে রেখো না। সুযোগ পেলেই কাছে এসো, ভালোবাসার কথা বোলো।

৬. বিসর্জনের দর্শন: শেষের মধ্যেই শুরুর বীজ

উমার কৈলাসে প্রত্যাবর্তনের এই লোককল্পনা আমাদের একটি গভীর সত্যের সামনে দাঁড় করায়। জীবনে কোনও কিছুই চিরকাল একই রকম থাকে না। আনন্দের দিন ফুরোয়, প্রিয়জন দূরে যায়, উৎসব শেষ হয়। তবু মানুষ বেঁচে থাকে স্মৃতি ও প্রত্যাশাকে সঙ্গে নিয়ে। বিসর্জন তাই কেবল হারানোর প্রতীক নয়; তা ছেড়ে দিতে শেখারও শিক্ষা। যে ভালোবাসে, সে জানে কাছে পাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি দূরে থাকার কষ্টও রয়েছে।

আর যে অপেক্ষা করতে জানে, সে জানে—কিছু বিদায়ের মধ্যেও ফিরে আসার সম্ভাবনা বেঁচে থাকে। বাংলার লোকায়ত কল্পনা সেই শক্তির পাশেই বসিয়ে দেয় এক মায়ের চোখের জল, এক মেয়ের বাপের বাড়ি ফেরার আনন্দ এবং আবার ফিরে যাওয়ার বিষাদ। এই দুইয়ের মিলনেই দুর্গোৎসব হয়ে ওঠে এত আপন, এত মানবিক।

শেষ দৃশ্য: আবার আসার প্রতিশ্রুতি

দেবী চলে যান, কিন্তু তাঁর জন্য অপেক্ষা কখনও শেষ হয় না। শরতের আকাশে তখনও কাশফুল দুলছে। নদীর জল ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। ঘাটের ভিড় কমে যায়। ঢাকিরা ফিরে যান নিজেদের ঘরে। মণ্ডপে আলো নিভে আসে একে একে। তবু কারও কারও মনে হয়, দেবী যেন এখনও কোথাও আছেন—মায়ের প্রার্থনায়, সন্তানের সাহসে, পরিবারের মিলনে, আর সেই মানুষটির চোখের জলে, যে বিসর্জনের সময় নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল।

উমা ফিরে গেছেন কৈলাসে। মেনকা আবার অপেক্ষা করবেন। আর বাংলার মানুষ দিন গুনবে পরের শরতের।




পিডিএফ ডাউনলোড | Print or Download PDF File