Dhanteras | ধনতেরাস ও ভগবান ধন্বন্তরি: জানুন এই পবিত্র উৎসবের পৌরাণিক কাহিনি ও এর বিশেষ তাৎপর্য!

Friday, November 6 2026, 1:23 pm
Dhanteras | ধনতেরাস ও ভগবান ধন্বন্তরি: জানুন এই পবিত্র উৎসবের পৌরাণিক কাহিনি ও এর বিশেষ তাৎপর্য!
highlightKey Highlights

দীপাবলি বা দীপোৎসবের সূচনালগ্নে পালিত হয় ধনতেরাস। এই দিনটি শুধু সোনা, রুপো কিংবা নতুন বাসনপত্র কেনার উৎসব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন ভারতীয় পুরাণ, আয়ুর্বেদ এবং সুস্বাস্থ্যের এক বিশেষ বিশ্বাস। হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুসারে, কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে সমুদ্র মন্থনের সময় আবির্ভূত হয়েছিলেন ভগবান ধন্বন্তরি। তাঁর হাতে ছিল অমৃতের কলস। সেই পৌরাণিক ঘটনাকে স্মরণ করেই পালিত হয় ধনতেরাস। কিন্তু ধনতেরাসের সঙ্গে ভগবান ধন্বন্তরির সম্পর্ক ঠিক কী? কেন তাঁর আবির্ভাবের দিনটিকে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়? আর এই উৎসবের সঙ্গে সোনা, রুপো ও ধনসম্পদ কেনার রীতিই বা কীভাবে যুক্ত হল? জেনে নেওয়া যাক ধনতেরাসের পৌরাণিক কাহিনি, ইতিহাস ও ধর্মীয় তাৎপর্য।


দীপাবলি বা দীপোৎসবের সূচনালগ্নে পালিত হয় ধনতেরাস। এই দিনটি শুধু সোনা, রুপো কিংবা নতুন বাসনপত্র কেনার উৎসব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন ভারতীয় পুরাণ, আয়ুর্বেদ এবং সুস্বাস্থ্যের এক বিশেষ বিশ্বাস। হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুসারে, কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে সমুদ্র মন্থনের সময় আবির্ভূত হয়েছিলেন ভগবান ধন্বন্তরি। তাঁর হাতে ছিল অমৃতের কলস। সেই পৌরাণিক ঘটনাকে স্মরণ করেই পালিত হয় ধনতেরাস।

কিন্তু ধনতেরাসের সঙ্গে ভগবান ধন্বন্তরির সম্পর্ক ঠিক কী? কেন তাঁর আবির্ভাবের দিনটিকে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়? আর এই উৎসবের সঙ্গে সোনা, রুপো ও ধনসম্পদ কেনার রীতিই বা কীভাবে যুক্ত হল? জেনে নেওয়া যাক ধনতেরাসের পৌরাণিক কাহিনি, ইতিহাস ও ধর্মীয় তাৎপর্য।

ধনতেরাসের অর্থ কী? (Dhanteras Meaning)

'ধনতেরাস' শব্দটি মূলত দুটি শব্দের সংমিশ্রণ—'ধন' এবং 'তেরস'। 'ধন' বলতে সম্পদ বা সমৃদ্ধিকে বোঝায়, আর 'তেরস' হল ত্রয়োদশী তিথির প্রচলিত নাম। অর্থাৎ, ধনতেরাসের অর্থ হল ধন-সম্পদ ও সমৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত ত্রয়োদশী তিথি। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে, কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দিনটি ধনত্রয়োদশী নামেও পরিচিত। এই দিন ভগবান ধন্বন্তরি, দেবী লক্ষ্মী এবং ধনসম্পদের অধিষ্ঠাতা কুবেরের আরাধনার প্রচলন রয়েছে।

তবে ধনতেরাসের তাৎপর্য শুধুমাত্র আর্থিক সমৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভগবান ধন্বন্তরির সঙ্গে এই দিনের যোগসূত্রের কারণে সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং রোগমুক্ত জীবনকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সমুদ্র মন্থন থেকে কীভাবে আবির্ভূত হন ভগবান ধন্বন্তরি?

ধনতেরাসের সঙ্গে ভগবান ধন্বন্তরির সম্পর্কের মূল সূত্র পাওয়া যায় হিন্দু পুরাণের সমুদ্র মন্থনের কাহিনিতে। পুরাণ অনুসারে, একসময় দেবতারা দুর্বল হয়ে পড়লে অসুরদের সঙ্গে তাঁদের শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়। হারানো শক্তি ফিরে পেতে দেবতারা ভগবান বিষ্ণুর পরামর্শ নেন। বিষ্ণু তাঁদের অসুরদের সঙ্গে মিলে ক্ষীরসাগর মন্থন করে অমৃত সংগ্রহের নির্দেশ দেন। অমৃত পান করলে দেবতারা অমরত্ব ও শক্তি ফিরে পাবেন—এমনটাই ছিল বিশ্বাস।

এরপর দেবতা ও অসুররা মন্দার পর্বতকে মন্থনদণ্ড এবং বাসুকি নাগকে রজ্জু হিসেবে ব্যবহার করে সমুদ্র মন্থন শুরু করেন। দীর্ঘ মন্থনের ফলে একে একে নানা মূল্যবান বস্তু ও দেবদেবীর আবির্ভাব ঘটে। এই ঘটনাগুলির মধ্যেই আবির্ভূত হন ভগবান ধন্বন্তরি। পৌরাণিক বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিলেন হাতে অমৃতপূর্ণ কলস নিয়ে। তাঁর এই আবির্ভাবকে অমৃত, জীবন ও সুস্বাস্থ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এই কারণেই কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথি ধনতেরাস হিসেবে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে বলে ধর্মীয় বিশ্বাস প্রচলিত।

কে এই ভগবান ধন্বন্তরি? কেন তাঁকে চিকিৎসাশাস্ত্রের দেবতা বলা হয়?

হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে ভগবান ধন্বন্তরিকে আয়ুর্বেদের অধিষ্ঠাতা দেবতা এবং চিকিৎসাশাস্ত্রের সঙ্গে যুক্ত এক গুরুত্বপূর্ণ দেবরূপে পূজা করা হয়। তাঁকে সাধারণত বিষ্ণুর অবতার বা ঐশ্বরিক চিকিৎসক হিসেবে বর্ণনা করা হয়।ধর্মীয় চিত্রকল্পে ধন্বন্তরির হাতে অমৃতের কলস দেখা যায়। কিছু চিত্রে তাঁর হাতে শঙ্খ, চক্র ও অন্যান্য প্রতীকও থাকে। এই অমৃতের কলস জীবনরক্ষা, রোগমুক্তি এবং দীর্ঘায়ুর প্রতীক।

আয়ুর্বেদ ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। ধন্বন্তরিকে কেন্দ্র করে প্রচলিত বিশ্বাসে সুস্থ শরীর ও সুস্থ জীবনযাপনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তাই ধনতেরাসের দিন শুধু সম্পদ লাভের প্রার্থনাই নয়, পরিবারের সকলের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনাও করা হয়।

ধনতেরাসে সোনা ও রুপো কেনার রীতি কীভাবে এল?

বর্তমানে ধনতেরাস বললেই অনেকের মনে প্রথমে আসে সোনা, রুপো, গয়না কিংবা নতুন বাসনপত্র কেনার কথা। এই দিন নতুন কিছু কেনাকে শুভ বলে মনে করেন বহু মানুষ।

ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, ধনতেরাসে মূল্যবান ধাতু বা নতুন সামগ্রী কেনা সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের প্রতীক। সোনা ও রুপোকে ঐতিহ্যগতভাবে সম্পদ এবং স্থায়িত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তবে এই রীতির ব্যাখ্যা অঞ্চল ও পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী আলাদা হতে পারে।

ধনসম্পদের পাশাপাশি ধনতেরাসে ধন্বন্তরির আরাধনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, সম্পদের সঙ্গে সুস্বাস্থ্যও জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। তাই এই উৎসবের মূল ভাবনায় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সুস্থ জীবন—দুইয়েরই গুরুত্ব রয়েছে।

ধনতেরাসে ধন্বন্তরি পুজোর তাৎপর্য কী?

ধনতেরাসের দিন অনেক জায়গায় ভগবান ধন্বন্তরির বিশেষ পুজো করা হয়। বিশেষত আয়ুর্বেদ ও চিকিৎসাশাস্ত্রের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের কাছে দিনটির ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে।

এই দিনে সাধারণত যে বিষয়গুলির জন্য প্রার্থনা করা হয়—

  • পরিবারের সদস্যদের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু।
  • রোগব্যাধি থেকে মুক্তি এবং সুস্থ জীবন।
  • জীবনে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি।
  • চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজে সাফল্য।
  • পরিবারে ইতিবাচক পরিবেশ ও মঙ্গল।

পুজোর নিয়ম ও মন্ত্র অঞ্চল, সম্প্রদায় এবং পারিবারিক রীতি অনুযায়ী আলাদা হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট কোনও নিয়মকে সর্বত্র এক বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

ধনতেরাস ও দীপাবলির মধ্যে সম্পর্ক কী?

ধনতেরাস হল পাঁচ দিনের দীপাবলি উৎসবের সূচনাপর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। সাধারণত ধনতেরাসের পর নরক চতুর্দশী বা ছোট দীপাবলি, দীপাবলি বা লক্ষ্মীপুজো, গোবর্ধন পুজো এবং ভাইফোঁটা পালিত হয়। তবে অঞ্চলভেদে উৎসবের দিন ও পালনের রীতিতে কিছু পার্থক্য দেখা যায়।

ধনতেরাসে ধন্বন্তরির আরাধনার মাধ্যমে সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুর কামনা করা হয়। অন্যদিকে দীপাবলির দিন দেবী লক্ষ্মীর পুজোর মাধ্যমে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রার্থনা করা হয়। এভাবেই দুটি উৎসব একে অপরের সঙ্গে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে যুক্ত।

ধনতেরাসকে অনেকেই শুধু কেনাকাটার উৎসব হিসেবে দেখেন। কিন্তু ভগবান ধন্বন্তরির পৌরাণিক কাহিনি এই দিনের আরও গভীর তাৎপর্য তুলে ধরে। সমুদ্র মন্থন থেকে তাঁর অমৃতের কলস হাতে আবির্ভাবের কাহিনি মানুষের কাছে জীবন, স্বাস্থ্য ও রোগমুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

'ধনতেরাস' বা 'ধনত্রয়োদশী' তাই শুধু ধনসম্পদ অর্জনের প্রার্থনার দিন নয়; এটি সুস্থ, সুন্দর ও সমৃদ্ধ জীবনের কামনারও উৎসব। জীবনে অর্থের প্রয়োজন থাকলেও সুস্বাস্থ্য ছাড়া সেই সম্পদের প্রকৃত আনন্দ উপভোগ করা সম্ভব নয়—ধন্বন্তরির আরাধনার মধ্য দিয়ে এই বার্তাই তুলে ধরে ধনতেরাস।




পিডিএফ ডাউনলোড | Print or Download PDF File