সূর্যমুখী বীজের স্বাস্থ্য উপযোগিতা | Health Benefits of Sunflower Seeds in Bengali

Friday, November 12 2021, 10:42 am
highlightKey Highlights

সূর্যমুখী ফুল শুধু সৌন্দর্যেই অনন্য নয়, গুণ ও কার্যকারিতার দিক থেকেও অতুলনীয়। সূর্যমুখী তেলের গুণাগুণ সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি কিন্তু সূর্যমুখী বীজের উপকারিতা সম্বন্ধে আমরা সন্দিহান। রোজকারের খাদ্যতালিকায় এই ক্ষুদ্র বীজ সংযুক্ত করলে আমাদের স্বাস্থ্যের অভাবনীয় পরিবর্তন হতে পারে।


সূর্যমুখীর ক্ষুদ্র বীজগুলোতে আছে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিকর উপাদান ।এতে আছে ২০% প্রোটিন, ৩৫~৪২% তেল ও ৩১% অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড।এছাড়াও এতে রয়েছে: ভিটামিন এ, ভিটামিন বি থ্রি ,ভিটামিন বিসিক্স ,ভিটামিন ই, ফোলেট। তাছাড়া সূর্যমুখী বীজের মধ্যে রয়েছে তামা, ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন ,দস্তা, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম ,ক্যালসিয়াম ,সেলেনিয়াম এর মতন খনিজ উপাদান ।

Sunflower Seeds
Sunflower Seeds

ডায়েটারি ফাইবার এবং প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিডে ভরপুর এ ক্ষুদ্র বীজ টি। এছাড়াও এর মধ্যে প্রচুর উদ্ভিদ যৌগ উপস্থিত যা এর শক্তিশালী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী। মিষ্টি বাদামজাতীয় সূর্যমুখী বীজ শরীরের নানা রোগ সারিয়ে তোলে ও বিভিন্নভাবে শরীরকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করে।

সূর্যমুখী বীজের উপকারিতা | Health Benefits of Sunflower Seeds

সাস্থের জন্যে সূর্যমুখী বীজের বিভিন্ন উপকারিতাগুলি নিম্নে বর্ণনা করা হলো - 

হজমের সহায়ক

দৈনন্দিন জীবনে হজমের সমস্যা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য মানুষের একটি নিত্যনৈমিত্তিক রোগের আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন খাদ্যতালিকায় সূর্যমুখী বীজ পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে এই সমস্যা থেকে মানুষ রেহাই পেতে পারে কারণ এতে আছে উন্নতমানের ডায়েটারি ফাইবার যা মানুষের হজমশক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে ও কোষ্ঠকাঠিন্য অনায়াসেই দূর করে।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে

কর্মব্যস্ত আধুনিক জীবনযাত্রায় হৃদরোগ এখন ঘরে ঘরে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে । প্রাণঘাতী এই রোগের ফলস্বরূপ হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়। উচ্চ রক্তচাপও এই রোগটিকে আরও ত্বরান্বিত করে থাকে। সূর্যমুখী বীজের মধ্যে উপস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ম্যাগনেশিয়াম ,মানুষের রক্তচাপ হ্রাস করে ও রক্তনালীকে শিথিল রাখতে সাহায্য করে। এ ছাড়াও অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড, বিশেষত লিনোলিক অ্যাসিড রক্তচাপ নিম্নমুখী করতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে যথেষ্ট অবদান রাখে।

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রক

রক্তে অধিক মাত্রায় কোলেস্টেরলের উপস্থিতি মানুষের শরীরকে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে। সূর্যমুখী বীজে রয়েছে এমন একটি উপাদান যাকে বলে ফাইটোস্টেরল যা রক্তের কোলেস্ট্রলের মাত্রা কমায়।

রক্তে শর্করার পরিমাণ হ্রাস করে

সূর্যমুখীর বীজ টাইপ- টু ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য সব থেকে বেশি স্বাস্থ্যোপযোগী ও কার্যকরী। এর অ্যান্টি অক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য এই সব রোগীদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী সাব্যস্ত হয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুসারে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় যারা নিয়মিত এক আউন্স (৩০ গ্রাম) সূর্যমুখীর বীজ গ্রহণ করে থাকেন তাদের রক্তে শর্করার প্রায় দশ শতাংশ হ্রাস পায়।

হাড়কে মজবুত ও শক্তিশালী করে

হাড়ের ক্ষয় বা জয়েন্টের নানান সমস্যা এখন প্রত্যেক ঘরে ঘরেই নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে । তবে পরিমাণমতো সূর্যমুখীর বীজ গ্রহণ করলে এই সমস্যা দূরীভূত হতে পারে।

এই বীজে রয়েছে উচ্চমানের ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম যা মানুষের হাড়ের কাঠামো শক্তিশালী করে তোলে এবং জয়েন্টের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করে। সূর্যমুখীর বীজ খনিজ পদার্থের খুব ভালো উৎস হবার কারণে এটি সুস্থও শক্তিশালী হাড় গঠনে সহায়তা করে।

এন্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান

সূর্যমুখীর বীজে রয়েছে উন্নতমানের ভিটামিন ‘ই’ যা এন্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে ও শরীরের বিভিন্ন অংশের জ্বালাপোড়া কমায় বা দেহের প্রদাহজনিত রোগের জন্য ও কাজ করে। নিয়মিত এটি সেবন করলে অস্টিওআর্থারাইটিস, অ্যাজমা ও বাতরোগ নিরাময় হতে পারে।

ওজন হ্রাসের সহায়ক 

অতিরিক্ত ওজন মানুষের দুশ্চিন্তার একটি প্রধান কারণ।তবে সূর্যমুখীর বীজ মানুষকে এ ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তা মুক্ত রাখতে এক অগ্রণী ভূমিকা নেয়। এর মধ্যে থাকা পলিস্যাচুরেটেড ফ্যাট ওজন কমাতে বিশেষভাবে সহায়তা করে । এই পুষ্টিকর বিভিন্ন উপস্থিত ভিটামিন বি ও ভিটামিন ই ক্যালরি বার্ন করতে সাহায্য করে যা ওজন হ্রাস করার একটি অন্যতম বড় মাধ্যম। সূর্যমুখীর বীজ যেমন পুষ্টিকর ঠিক তেমনই দীর্ঘ সময়ের জন্য মানুষের পেটকে পরিপূর্ণ রাখতে সাহায্য করে।

মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন

বর্তমান যুগে কমবেশি প্রত্যেক মানুষ ই মানসিক সমস্যায় ভোগে। প্রতিযোগিতার কারণে হরেক রকম মানসিক চাপ ও উদ্বেগ মানুষকে জর্জরিত করে তুলেছে ।

সূর্যমুখীর বীজে উপস্থিত ট্রিপটোফেন নামক এক প্রকারের এমিনো এসিড যা শরীরে সেরেটোনিন উৎপাদনে সাহায্য করে থাকে। সেরেটোনিন হল একটি বিশেষ উপাদান যা ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা ও হতাশা দূর করে। এটি মস্তিষ্ককে শান্ত রাখার সাথে সাথে মানুষের হতাশা ও মানসিক চাপকেও অনেকটা কমিয়ে দেয়। এর ফলে "অ্যাংজাইটি অ্যাটাকের' মতো ভয়াবহ সমস্যার থেকে মানুষ রেহাই পায়। এছাড়া এটি মাইগ্রেনের সমস্যা দূর করে এবং মস্তিষ্ককে শান্ত রাখতে সাহায্য করে।

অ্যান্টি এজিং বা বয়সের ছাপ কমায়

সূর্যমুখী বীজে এন্টি-এজিং উপাদান উপস্থিত থাকার কারণে ত্বকে বয়সের ছাপ পড়তে দেয় না।ভিটামিন ই ত্বকের এজিং প্রসেসকে ধীর করতে সাহায্য করে । এছাড়া রেডিক্যাল ক্ষয় ,সূর্যরশ্মি ও বিভিন্ন ক্ষতির হাত থেকে ত্বককে রক্ষা করে থাকে। ভিটামিন ‘ই’ ও বিটা ক্যারোটিন ত্বককে তারুণ্যদীপ্ত করে ও উজ্জ্বলতা বজায় রাখে। বিটা ক্যারোটিন ত্বককে সূর্যের ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখে এবং ভিটামিন ‘ই’ বলিরেখা পড়া প্রতিরোধ করে। সূর্যমুখীর বীজে উপস্থিত কপার, "মেলানিন' তৈরি করতে সাহায্য করে যা ক্ষতিকর আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি থেকে ত্বককে বাঁচায়।

ত্বককে জীবাণুমুক্ত রাখে

সারা দিনের ব্যস্ততায় ত্বকের যত্নের দিকে অনেকে খেয়াল রাখতে পারেন না যার ফলে ব্যাকটেরিয়া দ্বারা নানাভাবে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই ত্বককে সুরক্ষিত ও জীবাণুমুক্ত করতে প্রত্যেক দিনের খাদ্যতালিকায় সূর্যমুখী বীজ কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারে। এই বীজে উপস্থিত প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিডের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্য যা ত্বকের বিভিন্ন রোগ সমস্যা থেকে মানুষকে পরিত্রাণ দিতে পারবে ।

চুলের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও চুল পড়া বন্ধ করতে 

সূর্যমুখীর বীজে রয়েছে ভিটামিন বি-৬ যা মাথার স্কাল্পে অক্সিজেন যোগান করে চুলপড়া বন্ধ করে। স্বাস্থ্যোজ্জ্বল নতুন চুল গজাবার সাহায্য করে সূর্যমুখীর বীজ । এতে কপার থাকার কারণে চুলের স্বাভাবিক রং নষ্ট হতে দেয় না। এতে উপস্থিত ওমেগা৬ চুলের হারানো আর্দ্রতা কে পুনরুদ্ধার করে চুলকে কোমল ও প্রাণোজ্জ্বল করে তোলে । সূর্যমুখী বীজে উপস্থিত জিঙ্ক ও ভিটামিন ই স্ক্যাল্পে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে তোলে যার কারণে ও নতুন চুল গজায়।

ক্যান্সার প্রতিরোধক

সূর্যমুখী বীজে আছে উচ্চমানের ফাইটোস্টেরল ও লিগন্যানস যা ক্যান্সার এর মত মারণ রোগও রোধ করতে সহায়তা করে। উপরিউক্ত উপাদানগুলি শরীরে ক্যান্সারের কোষ তৈরি হতে দেয় না।

ত্বককে কোমল রাখে

সূর্যমুখীর বীজ ফ্যাটি এসিডের ভালো উৎস হওয়ার কারণে ত্বকের ইলাস্টিসিটি বা নমনীয়তা ধরে রেখে ত্বককে মসৃণ ও কোমল করে তোলে।

দাগ দূর করে

সূর্যমুখী বীজের মধ্যকার ফ্যাটি এসিড ত্বকে কোলাজেন ও এলাস্টিন উৎপাদন করে ও দাগ দূর করে। এতে থাকা এন্টিব্যাকটেরিয়াল প্রপার্টিজ জীবাণুর সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।

স্নায়ুতন্ত্রকে সুস্থ রাখে

সূর্যমুখী বীজে উপস্থিত প্রয়োজনীয় ম্যাগনেশিয়াম ,নার্ভ সেলের অতিরিক্ত ক্যালশিয়ামের মাত্রা কমিয়ে দেয় যা স্নায়ুতন্ত্রকে সঠিকভাবে কাজ করাতে সাহায্য করে।

শক্তিবর্ধনকারী

সূর্যমুখী বীজের মধ্যে উপস্থিত উচ্চমাত্রার প্রোটিন শক্তি স্তর বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। ভিটামিন বি ও সেলেনিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় উপাদানগুলিও শক্তিবর্ধক হিসেবে কাজ করে। ভিটামিন বি১ খাদ্যকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে এবং শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায়। সেলেনিয়াম রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে শরীরে প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের জোগান দেয় ।

সূর্যমুখীর বীজ একটি সর্বগুণসম্পন্ন খাবার যা শরীরকে পুষ্টির দেওয়ার সাথে সাথে তাকে সুস্থ ও সবল রাখে এবং ত্বক ও চুলের পরিচর্যা ও করে একই সময়ে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পরিমিত পরিমাণে সূর্যমুখীর বীজ রাখলে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এবং এটি রোগমুক্ত জীবন অতিবাহিত করা যায়।

FAQ (সম্ভাব্য প্রশ্নাবলি)

  1. সূর্যমুখীর বীজে অ্যামাইনো অ্যাসিড আছে তার নাম কী ? ~ সূর্যমুখীর বীজে উপস্থিত ট্রিপটোফেন নামক এক প্রকারের এমিনো এসিড অাছে।
  2. সূর্যমুখী বীজে উপস্থিত কোন দুটি ভিটামিন ক্যালোরি বার্ন করতে সাহায্য করে? ~ ভিটামিন বি ও ভিটামিন ই<br>
  3. সূর্যমুখী বীজে উপস্থিত কোন দুটি উপাদান ক্যানসার প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে? ~ ফাইটোস্টেরল ও লিগন্যানস
  4. কোন ভিটামিনের উপস্থিতি চুল পড়া বন্ধ করে? ~ ভিটামিন বি-৬
  5. সূর্যমুখীর বীজে কত শতকারা প্রোটিন উপস্থিত? ~ ২০% প্রোটিন <br>


telegram channel Viral News on Telegram