Durga Puja 2026 | মহিষাসুরবধ থেকে চণ্ড-মুণ্ডবধ, নবরূপে দেবীমাহাত্ম্য বর্ণনা!

Key Highlightsদেবী দুর্গার দশ হাতে দশ অস্ত্র। কখনও তিনি সিংহবাহিনী মহিষাসুরমর্দিনী, কখনও রক্তবীজবধকারিণী কালিকা, আবার কখনও চণ্ড-মুণ্ডবধকারিণী ভয়ংকরী চামুণ্ডা। এই বিচিত্র রূপগুলির মধ্যে নিহিত রয়েছে প্রাচীন ভারতীয় ধর্মচিন্তার গভীর শক্তিতত্ত্ব। দেবী কেবল সৃষ্টির আধার নন, তিনি সৃষ্টিকে রক্ষা করেন, ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রয়োজনে অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটান। মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত দেবীমাহাত্ম্য, যা দুর্গাসপ্তশতী বা চণ্ডী নামেও পরিচিত, দেবীর এই বহুমাত্রিক রূপের বর্ণনা দেয়। গ্রন্থটির তিনটি প্রধান পর্বে রয়েছে মধু-কৈটভবধ, মহিষাসুরবধ এবং শুম্ভ-নিশুম্ভের বিরুদ্ধে দেবীর যুদ্ধ। প্রথম পর্বে যোগনিদ্রারূপিণী মহাশক্তির প্রভাবে বিষ্ণুর জাগরণ এবং মধু-কৈটভের বিনাশ ঘটে। দ্বিতীয় পর্বে দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে আবির্ভূতা হন মহিষাসুরমর্দিনী। দেবতাদের অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তিনি মহিষাসুরকে বধ করেন এবং স্বর্গে শান্তি ফিরিয়ে আনেন। এই কাহিনি সম্মিলিত শক্তি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক। তৃতীয় পর্বে চণ্ড-মুণ্ডবধের মাধ্যমে কালিকা ‘চামুণ্ডা’ নামে পরিচিত হন। এরপর রক্তবীজের রক্ত থেকে অসংখ্য অসুরের জন্মের বিপদ রুখে দেবী তারও বিনাশ ঘটান। শেষ পর্যন্ত শুম্ভ-নিশুম্ভকে পরাজিত করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন যে তাঁর বিভিন্ন রূপ একই মহাশক্তির প্রকাশ। শাক্ত দর্শনে মহাকালী, মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতীর রূপে এই শক্তির বিভিন্ন দিক প্রকাশিত হয়েছে—প্রলয় ও পরিবর্তন, শৃঙ্খলা ও সুরক্ষা, এবং জ্ঞান ও কৌশল। দুর্গাপূজার এই পৌরাণিক কাহিনিগুলি তাই শুধু অসুরবধের আখ্যান নয়; এগুলি নারীশক্তি, সাহস, স্বাধীনতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চিরন্তন বার্তা বহন করে।
দেবী দুর্গার দশ হাতে দশ অস্ত্র। কখনও তিনি সিংহবাহিনী মহিষাসুরমর্দিনী, কখনও রক্তবীজের রক্তপানে উদ্যত কালিকা, আবার কখনও চণ্ড-মুণ্ডবধকারিণী ভয়ংকরী চামুণ্ডা। দেবী দুর্গার এই বিচিত্র রূপগুলি নিছক পৌরাণিক কল্পনার বৈচিত্র্য নয়; এগুলির মধ্যে নিহিত রয়েছে প্রাচীন ভারতীয় ধর্মচিন্তার এক গভীর শক্তিতত্ত্ব। এখানে নারী কেবল সৃষ্টির আধার নন, তিনি সৃষ্টিকে রক্ষা করেন, ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রয়োজনে ধ্বংস করতেও পিছপা হন না।

মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত দেবীমাহাত্ম্যে (দুর্গাসপ্তশতী বা চণ্ডী নামেও পরিচিত), দেবীর এই বহুমাত্রিক রূপের বর্ণনা রয়েছে। তেরোটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই গ্রন্থের সাতশো শ্লোকে দেবীর মহিমা, অসুরবধ এর বিস্তৃত বিবৃতি আছে। গ্রন্থটির কাহিনি তিনটি প্রধান পর্বে বিভক্ত—মধু-কৈটভবধ, মহিষাসুরবধ এবং শুম্ভ-নিশুম্ভের বিরুদ্ধে দেবীর যুদ্ধ।
১. মহাকালীর আবির্ভাব: যোগনিদ্রা থেকে বিশ্বরক্ষার সূচনা
দেবীমাহাত্ম্য-এর প্রথম কাহিনির সূত্রপাত বিষ্ণুর যোগনিদ্রাকে কেন্দ্র করে। সৃষ্টির আদিকালে বিষ্ণু যখন যোগনিদ্রায় নিমগ্ন, তখন তাঁর কর্ণমল থেকে উৎপন্ন হলো মধু ও কৈটভ দুই অসুর। জন্ম নিয়েই তাঁরা ব্রহ্মাকে হত্যা করতে উদ্যত হলো। সৃষ্টির ধারাবাহিকতা বিপন্ন হয়ে পড়ছে উপলব্ধি করে ব্রহ্মা তখন বিষ্ণুর অন্তর্নিহিত যোগনিদ্রারূপিণী মহাশক্তির স্তব শুরু করেন। তাঁর প্রার্থনায় বিষ্ণুর দেহ থেকে যোগনিদ্রারূপে দেবী প্রত্যাহৃত হন এবং মধু-কৈটভের বিনাশ করেন।

এই আখ্যানে দেবী কেবল কোনও দেবতার সহায়িকা নন; তিনি যুদ্ধ ক্রীড়ায় পারদর্শী এক নারী। তিনি অবলীলায় অশুভ শক্তির বিনাশ করে ধর্মরক্ষা করেন। শাক্ত দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা এই আখ্যান থেকেই এসেছে—শক্তি ছাড়া শিব বা বিষ্ণুর মতো দেবতাও কার্যত নিষ্ক্রিয়। শক্তি বিশ্বকে সচল রাখে; কখনও নিদ্রা, কখনও জাগরণ, কখনও সৃষ্টির সম্ভাবনা, আবার কখনও ধ্বংসের অবসান ঘটানোর ক্ষমতা আছে তাঁর।
২. মহিষাসুরমর্দিনী: দেবতাদের সম্মিলিত তেজের মহিমা:
দ্বিতীয় অধ্যায়ে ব্রহ্মার বর লাভ করে দেবতাদের পরাস্ত করে স্বর্গরাজ্য অধিকার করে মহিষাসুর। বিপদ শিয়রে বুঝে স্বর্গচ্যুত দেবতারা ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের স্মরণ নেন। ত্রিদেবের ক্রোধ ও তেজ থেকে এক অসামান্য জ্যোতিরাশি প্রকাশিত হয়। সেই তেজের সমন্বয়ে আবির্ভূতা হন দেবী মহিষাসুরমর্দিনী। দেবীমাহাত্ম্য-এর বর্ণনা অনুযায়ী দেবীর বাহন সিংহ প্রদান করেছিলেন হিমালয়; দেবতারা তুলে দেন বিভিন্ন অস্ত্র ও অলংকার। শিবের ত্রিশূল, বিষ্ণুর চক্র, ইন্দ্রের বজ্র এবং বরুণের পাশে সুসজ্জিত দেবী বধ করেন মহিষাসুরকে।

এখানে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পৌরাণিক বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়। দেবতারা প্রত্যেকে শক্তিধর, কিন্তু তাঁদের পক্ষে এককভাবে মহিষাসুরকে পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। বরং আদ্দ্যাশক্তি মহামায়াকে আহ্বান করে যুদ্ধের প্রধান নায়িকার পদ দিতে হয়েছে তাঁকে, দেবতারা পালন করেছেন শক্তির স্বীকৃতিদাতা এবং অস্ত্রদাতার পদ।
৩. চণ্ড-মুণ্ডবধ: কৌশিকী থেকে চামুণ্ডার আবির্ভাব
তৃতীয় চরিত্রে দেবী আরও রণরঙ্গিনী। পুরান অনুযায়ী, শুম্ভ ও নিশুম্ভ দুই অসুরভ্রাতা দেবলোক অধিকার করে দেবতাদের ক্ষমতাচ্যুত করে। দেবীর অপরূপ রূপের কথা শুনে তারা তাঁকে নিজেদের অধিকারে আনার ইচ্ছেপ্রকাশ করে। দূত পাঠিয়ে দেবীকে বিবাহের প্রস্তাব রাখে তারা। দেবী জানান, যে তাঁকে যুদ্ধে পরাজিত করতে পারবে, তাকেই তিনি গ্রহণ করবেন। এই পর্বে দেবী নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল এক স্বাধীন সত্তা। তাঁর সম্মতি জোর করে আদায় করা যায় না। তা জয় করে নিতে হয়। শুম্ভ-নিশুম্ভের সেনাপতি চণ্ড ও মুণ্ড দেবীকে আক্রমণ করতে এলে দেবীর মুখমণ্ডল ক্রোধে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। তাঁর ভ্রূকুটি থেকে আবির্ভূতা হন এক ভয়ংকরী দেবী—কালিকা।

দেবী কালিকা চণ্ড ও মুণ্ডকে বধ করে তাঁদের মুণ্ড দেবীর পদতলে রাখেন। তখন দেবী তাঁকে ‘চামুণ্ডা’ নামে অভিহিত করেন। চামুণ্ডা দেবীর উগ্রতা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চরম প্রকাশ।
৪. রক্তবীজবধ: যে অশুভকে আঘাত করলে সে বহুগুণে বাড়ে
দেবীমাহাত্ম্য অনুযায়ী, পুরাকালে রক্তবীজ নাম এক অসুর ছিল। তার শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়লেই সেই রক্ত থেকে তারই মতো আরেকটি অসুর জন্ম নিতো। তাকে যত আঘাত করা হতো, তার সংখ্যা তত বাড়তে থাকতো। এই অদ্ভুত বরের কারণে দেবতাদের পক্ষে এই অসুরকে পরাস্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। তখন দেবী চণ্ডিকা কালিকাকে নির্দেশ দেন, রক্তবীজের রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা পান করতে হবে। কালিকা তাঁর বিশাল মুখ বিস্তার করে রক্তবীজের শরীর থেকে নির্গত রক্ত পান করতে থাকেন।

চামুণ্ডার সহায়তায় শেষ পর্যন্ত দেবী রক্তবীজ বধ করেন। এই আখ্যানের প্রতীকী ব্যাখ্যা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই আখ্যান আমাদের শেখায় হিংসা থেকে হিংসা, প্রতিশোধ থেকে প্রতিশোধ, বিদ্বেষ থেকে নতুন বিদ্বেষের জন্ম হতে পারে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিহিত: অশুভের বিরুদ্ধে সংগ্রামে শুধু শক্তি প্রয়োগ করলেই চলে না, তার বিস্তারের পদ্ধতিও বুঝতে হয়।
৫. শুম্ভ-নিশুম্ভবধ: দেবী কি এক, না বহু?
চণ্ড-মুণ্ড ও রক্তবীজের বিনাশের পর শুম্ভ-নিশুম্ভের সঙ্গে দেবীর শেষ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অসুররা সর্বশক্তি দিয়ে দেবীকে আক্রমণ করে। দেবতাদের শক্তিরূপে মাতৃকাদেরও যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়। ব্রাহ্মণী, মাহেশ্বরী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, বারাহী, নরসিংহী, ঐন্দ্রী, প্রত্যেক দেবী নির্দিষ্ট দেবতার শক্তিরূপে প্রকাশিত হয়ে অসুরবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে শুম্ভ দেবীকে অভিযোগ করে যে তিনি অন্য দেবশক্তির সহায়তায় যুদ্ধ করছেন। তখন দেবী শুম্ভকে তাঁর শতরূপ দর্শন করান। জগতে তিনি একাই বিরাজমান; নানারূপে। শুম্ভের সঙ্গে চূড়ান্ত যুদ্ধে দেবী তাঁকে পরাস্ত করেন। দেবলোকের ওপর অসুরদের আধিপত্যের অবসান ঘটে।
৬. মহাকালী, মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতী: শক্তির তিন মহিমা
দেবীমাহাত্ম্যের তিনটি প্রধান চরিত্রের সঙ্গে পরবর্তী শাক্ত ব্যাখ্যায় মহাকালী, মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতীর তিনটি মহিমাকে যুক্ত করা হয়।

মহাকালী সময়, নিদ্রা, প্রলয় এবং অন্ধকারের গভীর শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। মধু-কৈটভবধের আখ্যানের মধ্য দিয়ে তাঁর শক্তির প্রকাশ বোঝানো হয়।
মহালক্ষ্মী মহিষাসুরমর্দিনী রূপে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অসুরশক্তির বিনাশের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মধ্যে ঐশ্বর্য কেবল সম্পদ নয়; তা বিশ্বব্যবস্থার ভারসাম্য ও শক্তির পূর্ণতারও প্রতীক।
মহাসরস্বতী শুম্ভ-নিশুম্ভের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত এক জ্ঞানী কৌশলী শক্তিরূপ। এখানে জ্ঞান নিষ্ক্রিয় নয়; তা যুদ্ধের সিদ্ধান্ত, পরিস্থিতি বিচার এবং শত্রুর মোকাবিলার ক্ষমতা রাখে। এই তিন রূপ আসলে একই মহাশক্তির তিনটি কার্যগত প্রকাশ।

দুর্গাপূজার আবহে এই পৌরাণিক আখ্যান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শক্তি কেবল বাহুবল নয়; তা সচেতনতা, ঐক্য, স্বাধীনতা, কৌশল এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সামর্থ্যও। মহিষাসুরমর্দিনীর সিংহবাহিনী রূপ আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা বলে; চামুণ্ডার ভয়ংকরী অবয়ব স্মরণ করিয়ে দেয়, কখনও কখনও অন্যায়ের বিস্তার রোধ করতে কঠোর প্রতিরোধের প্রয়োজন হয়। আর দেবীমাহাত্ম্যের একত্বের ঘোষণা জানায়, বহুরূপের অন্তরালে শক্তির উৎস এক।
- Related topics -
- পুজো ও উৎসব
- দুর্গাপুজো
- অন্যান্য









