Durga Puja 2026 | কাঠির টানে পূজার প্রাণ: ঢাকিদের ভিন্ন সুর ও লোকসংগীতের ঐতিহ্য!

Sunday, October 18 2026, 10:00 am
Durga Puja 2026 | কাঠির টানে পূজার প্রাণ: ঢাকিদের ভিন্ন সুর ও লোকসংগীতের ঐতিহ্য!
highlightKey Highlights

শরতের আকাশ, শিউলি আর কাশের বনে যখন উৎসবের আবহ, তখন বাঙালির হৃদয় দোলা দেয় ঢাকের চিরপরিচিত সুর। দুর্গাপুজো (durga puja celebration) মানেই আলোর রোশনাই আর দেবীর আরাধনা, তবে এই পূজার প্রকৃত প্রাণস্পন্দন লুকিয়ে রয়েছে ঢাকিদের (dhaki) হাতের কাঠিতে। ঢাকের এই বিচিত্র ছন্দ ও বোলই নির্ধারণ করে দুর্গাপূজার প্রতিটি মুহূর্তের আবেগ ও আবহ। দুর্গাপূজার প্রতিটি দিন এবং শাস্ত্রীয় প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠানের সাথে জড়িয়ে রয়েছে ঢাকের আলাদা আলাদা সুর ও তালের 'বোল'। ঢাকিদের এই সুর কিন্তু কোনো লিখিত স্বরলিপি দেখে বাজে না; সবই স্মৃতির কোঠা থেকে বংশপরম্পরায় প্রবাহিত হয়ে আসছে।


শরতের আকাশ, শিউলি আর কাশের বনে যখন উৎসবের আবহ, তখন বাঙালির হৃদয় দোলা দেয় ঢাকের চিরপরিচিত সুর। দুর্গাপুজো (durga puja celebration) মানেই আলোর রোশনাই আর দেবীর আরাধনা, তবে এই পূজার প্রকৃত প্রাণস্পন্দন লুকিয়ে রয়েছে ঢাকিদের (dhaki) হাতের কাঠিতে। ঢাকের এই বিচিত্র ছন্দ ও বোলই নির্ধারণ করে দুর্গাপূজার প্রতিটি মুহূর্তের আবেগ ও আবহ। দুর্গাপূজার প্রতিটি দিন এবং শাস্ত্রীয় প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠানের সাথে জড়িয়ে রয়েছে ঢাকের আলাদা আলাদা সুর ও তালের 'বোল'। ঢাকিদের এই সুর কিন্তু কোনো লিখিত স্বরলিপি দেখে বাজে না; সবই স্মৃতির কোঠা থেকে বংশপরম্পরায় প্রবাহিত হয়ে আসছে।

ঢাকের বোল ও তার বৈচিত্র্যময় সুরের মূল ছন্দ : 

বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও মুর্শিদাবাদের মতো প্রত্যন্ত জেলা থেকে আসা ঢাকিদের কাছে ঢাক বাজানো শুধু পেশা নয়, এটি একটি ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প। কাঠের তৈরি ভারী ঢাক (dhak) কাঁধে নিয়ে তারা যে বিচিত্র সুর তুলে ধরেন, তা কোনো লিখিত স্বরলিপি ছাড়াই বংশানুক্রমে শেখা হয়। প্রতিটি পূজার দিন এবং আচারের জন্য নির্ধারিত রয়েছে নিজস্ব কিছু বোল।

   [বোধন ও ষষ্ঠী]  -->  ধীর ও গম্ভীর তাল (মঙ্গল আবাহন)

          │

    [মহা সপ্তমী]     -->  "তা-ধিন-তা", "গুরু-গুরু" (প্রাণপ্রতিষ্ঠা)

          │

    [অষ্টমী ও সন্ধিপূজা]--> দ্রুত ও তীব্র "ঝাঁপতাল" (১০৮ প্রদীপ প্রজ্বলন)

          │

    [ধুনুচি নাচ]     -->  অত্যন্ত দ্রুত ও উন্মাদনাময় তাল

          │

    [বিসর্জন]        -->  করুণ ও বিষাদময় সুর (বিদায় বার্তা)

দিন অনুযায়ী ঢাকের ছন্দ ও রীতিনীতি : 

দুর্গাপূজার সূচনা থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত ঢাকের কাঠি কীভাবে পাল্টে দেয় মণ্ডপের পরিবেশ:

মহা ষষ্ঠী: দেবীর আবাহন ও ধীর গম্ভীর সুর :

ষষ্ঠীর দিন বেলতলায় দেবী দুর্গার বোধন ও আবাহনের মধ্য দিয়ে পূজার সূচনা হয়। এই দিন ঢাকিরা ধীর ও গম্ভীর তালে কাঠি ছোঁয়ান। "তা-ক-ধিন-তা" বোলে থাকে এক অদ্ভুত ভক্তি ও শ্রদ্ধার আবহ, যা দেবী আগমনের বার্তা ঘোষণা করে।

মহা সপ্তমী (Saptami): নবপত্রিকা ও প্রাণের স্পন্দন : 

সপ্তমী (saptami)-র সকালে নবপত্রিকা (কলাবৌ) স্নান করিয়ে মণ্ডপে প্রবেশ করানোর সময় বাজে উল্লাস ও মঙ্গলাচরণের বোল। "গুরু-গুরু-ধিন", "তা-ধিন-তা" ছন্দে থাকে এক ধরনের গতিময়তা ও আনন্দ, যা মণ্ডপে পূজার আসল আমেজ তৈরি করে।

 মহা অষ্টমী ও সন্ধিপূজা: চরম উত্তেজনা ও তীব্র বোল : 

অষ্টমীর আরতি এবং বিশেষ করে সন্ধিপূজার ১০৮টি পদ্ম ও প্রদীপ প্রজ্বলনের সময় ঢাকের তালে দেখা যায় চরম নাটকীয়তা। এই সময় ঢাকিরা দ্রুত থেকে দ্রুততর তালে "ঝাঁপতাল" বাজান। কাঁসরের শব্দের সাথে ঢাকের এই দ্রুত বোল ভক্তদের মনে এক অলৌকিক অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।

নবমী ও ধুনুচি নাচ: গতি আর উন্মাদনার চরম প্রকাশ : 

আরতির পর ধুনুচি নাচের সময় ঢাকিদের বোল পৌঁছায় তার শিখরে। দ্রুত "ধাগা-তেটে-তা", "ধিন-তা-কা-তা" তালে ধুনুচি নাচিয়েদের সাথে সাথে পুরো মণ্ডপ যেন নাচতে শুরু করে। এই সময় ঢাকিরা নিজেদের শারীরিক সহনশীলতার চরম পরীক্ষা দেন।

বিজয়া দশমী: বিষাদ ও বিদায়ের আকুল সুর: 

বিসর্জনের সময় ঢাকের তালে আর আনন্দ থাকে না; সেখানে ফুটে ওঠে বিদায়ের যন্ত্রণা। "যাবে মা গো বলিস নে আর", "টিন-টিন-টিন-তা" বোলে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। মায়ের বিদায়বেলায় এই ব্যাকুল সুর প্রতি বাঙালিকে ভারাক্রান্ত করে তোলে।

উৎসবের দিনগুলোতে কলকাতা ও অন্যান্য বড় শহরের আলোঝলমলে মণ্ডপে যে ঢাকের আওয়াজ শোনা যায়, তার নেপথ্যে রয়েছে গ্রামবাংলার প্রান্তিক শিল্পীদের চরম ত্যাগ ও সাধনা। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও পূর্ব বর্ধমানের মতো প্রত্যন্ত জেলা থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার ঢাকি শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

বিশাল ও ভারী কাঠের ঢাক (dhak) কাঁধে ঝুলিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একনাগাড়ে বাজিয়ে যাওয়া মোটেও সহজ কথা নয়। এর জন্য প্রয়োজন অসাধারণ শারীরিক সহনশীলতা, হাতের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘদিনের কঠোর অনুশীলন। বংশানুক্রমে তাদের রক্তে প্রবাহিত হয় এই বিশেষ তাল ও ছন্দ। অভাব-অনটন এবং আধুনিক জীবনের নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া এই লোকশিল্পকে তারা পরম মমতায় আগলে রেখেছেন।




পিডিএফ ডাউনলোড | Print or Download PDF File